06/01/2026
২৪শের পুলিশ, ২৬ শের পুলিশ
……………………………….
২৪শের বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র ছিল পুলিশ। সরকারের কর্মকর্তা -কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী– সবার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সমালোচিত ছিল পুলিশ।জনগণের ধারনা, আইনশৃংখলা রক্ষার চেয়ে সরকারকে রক্ষার ভূমিকাই ছিল তাদের প্রধান । তারা জনগণের পুলিশ না হয়ে একটি দলের পুলিশ হয়ে উঠেছিল। সরকারের সব বাহিনী -কর্মকর্তাদের মধ্যে জনগণের রোষ তাদের উপরেই ছিল বেশি। ফলে ২৪ শের আগস্টে অজস্র থানায় আক্রমণ ঘটেছে, বেশ কিছু পুলিশের দুঃখজনক মৃত্যু ঘটেছে। এই মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে। সরকারি হিসেবে সংখ্যাটি ৪৯। স্বৈরাচারের সুশীলরা সংখ্যাটাকে বানিয়েছে ১০০০০, আর আবুলরা সংখ্যাটাকে ৫০ হাজারের উপরে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ গুষ্টিটি পুলিশের জন্য যত কান্নাকাটি করেছে, তত কান্না মনে হয়, তাদের মা-বাবা বা স্বজনদের মৃত্যুতেও করেনি।
যাইহোক, পুলিশের প্রতি জনগণের যে বিরূপ মনোভাব, তাতে পুরো বাস্তবতা ফুটে ওঠে না । বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে এখনো ভালো মানুষদের সংখ্যাই বেশি। এদের একটি বড় অংশ হৃদয়ে জুলাইয়ের চেতনা কে লালন করে। তারা কোন স্বৈরাচারী দলের খুনি হিসাবে থাকতে চায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে অনেক পুলিশ রয়েছেন, আমার রোগীদের মধ্যেও অনেক পুলিশ রয়েছেন। আমি তাদের খুব ভালো করে জানি। বাংলাদেশের মতো একটি অর্ধসভ্য, নোংরা রাজনীতির দেশে পুলিশের কাজ যে কত কঠিন, এটাও আমরা বুঝি। এর মধ্যেও বাংলাদেশের পুলিশের এক বড় অংশ , খুব অল্প সুযোগ সুবিধার মধ্যেও সুচারুভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ২৪শে করাল দুঃসময়ের মধ্যেও তারা নিজ সংযমের পরিচয় দিয়েছেন।
কিন্তু সমস্যা ছিল দলবাজ পুলিশদের নিয়ে। যারা অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য মানুষের বুক বরাবর গুলি চালিয়েছে। এরা মানুষ নয়, নিকৃষ্ট প্রাণী বা তার চেয়েও অধম। এদের পরিণতি যতই খারাপ হোক, এতে কারো কোন আফসোস নেই। বেনজির, হারুনদের পুলিশী কার্যক্রম সবাই দেখেছেন, পতিত স্বৈরাচার তাদের কার্যক্রমে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। এরা কিন্তু কারো জন্য তাদের কাজগুলো করেনি, শুধুমাত্র পদ-পদবী ও হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার জন্য তারা এটা করেছে। এরা এখন দেশের উচ্চসম্পদশালীদের বড় অংশ। এরা মূলত পুলিশ ছিল না, ভাড়াটে খুনি ছিল। এরাই পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। সাধারণ পুলিশরা এদেরকে ভীষণভাবে ঘৃণা করে।
খুনি গুন্ডাদের একটি বড় অংশ এখনো পুলিশে কাজ করছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুলের মধ্যে একটি হচ্ছে , এদেরকে সনাক্ত করার উদ্যোগ না নেওয়া।
এটা খুবই দুঃখজনক যে, বিপ্লবী সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থায়, ওসমান শরীফ হাদীর মত বিপ্লবী স্বৈরাচারীর গুন্ডাদের হাতে খুন হল এবং তার মৃত্যুর এতদিন পরেও কেউ খুনির কেশাগ্র ও স্পর্শ করতে পারেনি। একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি ও অপরাধ বিজ্ঞানের যতটুকু বিকাশ হয়েছে, তাতে পুলিশের পক্ষে কোন খুনিকে খুঁজে না পাওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু স্বৈরাচারীর সুবিধাভোগী পুলিশদের হাদির খুনিকে ধরার কোন সদিচ্ছাই ছিল না এবং আমি মনে করি হাদির খুনিকে ভবিষ্যতেও ধরা সম্ভব হবে না।
হবিগঞ্জে জুলাই সৈনিক মাহদী হাসানকে যখন গ্রেফতার করা হলো, তখন আমি আশ্চর্য হয়েছি। বিপ্লবের মাত্র এক বছর হয়েছে এখনই পুলিশ তার পূর্বের সংস্কৃতিতে ফিরে গেছে। অনেক সুশীল প্রশ্ন করেছেন, সন্ধ্যায় গ্রেফতার করে সকলেই কেন ওকে ছেড়ে দেওয়া হলো। আমি বলি, ও তো হাজতে কয়েক ঘন্টা ছিল, একজন বিপ্লবীকে কয়েক মিনিটও ধরে রাখার কোন নৈতিক অধিকার পুলিশের নেই। কারণ, এসব পুলিশরা অভিযুক্ত, তারা বিপ্লবীদের বুকে সরাসরি গুলি করেছে। বিপ্লবীদের ধরে বিচার করার আগে তেদের বিচার হওয়াখু উচিত।গাজীপুরের সুরভী। প্রচন্ড সাহসী একটা মেয়ে। চব্বিশের জুলাইয়ে তার বক্তব্য আন্দোলনের মাঠকে অনেকবারই কাপিয়ে দিয়েছিল।একটা দালাল সাংবাদিক তাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য একটি কেইস হয়তো করেছে, এজন্য কি পুলিশকে গভীর রাতে তাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে থানায় নিতে হবে? কোনটা ভুয়া মামলা আর কোনটা সত্যিকারের - সেটা বোঝার মতো কমন সেন্স কী পুলিশের নেই? পুলিশ কিভাবে একটি সতের বছরের মেয়ের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল? কোন কুলাংগার মাজিস্ট্রেট আবার সেই রিমান্ড মঞ্জুর করে? বিপ্লবীদের নড়াচড়া দেখে এই চোর বাটপারদের জামিন দিতেও দেরি হয় না। নৈতিকভাবে চুড়ান্ত দুর্বল হলেই মানুষ এভাবে কাজ করে।
পুলিশ- প্রশাসন বারবার এগুলো করছে এবং আরো করবে। এগুলোর কোনো বিচার ও হবে না। গণধিকার পরিষদের নুরুল হক কে হাতের শখ মিটিয়ে বেধড়ক পেটালো, কোনো বিচার হননি।
দোষী পুলিশদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে এরকম ঘটতেই থাকবে। আমি বলব, অবশ্যই বাংলাদেশের যত এলাকায় জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষ শহীদ হয়েছে তত এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতে মামলা করা উচিত। ফেব্রুয়ারির পরে কিন্তু দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে যাবে। দলীয় সরকার আসার পরই এসব দলবাজ পুলিশদের জামাই আদর শুরু হবে। এসব পুলিশ্ ই তখন বেছে বেছে বিপ্লবীদের উপর তীব্র প্রতিশোধ নেবে।
কিছু কাজ ফেব্রুয়ারির ভেতরে শেষ করা উচিত। শত্রুকে সময়মত এবং জায়গামতো আঘাত করতে হয়।
শরীফ হাদীর মৃত্যুর পর তার জানাযায় লক্ষ মানুষের ঢল দেখে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে–জুলাইয়ের চেতনা এখনো ক্ষয় হয়নি। চেতনাকে সংহত রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বর্তমানে যে অন্তবর্তী সরকার -সেটা কোন প্রচলিত আইনি সরকার নয়, এর কোন আইনগত ভিত্তি নেই। জুলাইয়ের বিপ্লবই এ সরকারের একমাত্র ভিত্তি ও শক্তি। যারা জুলাইকে ধারন করবে না, তারাই দেশবিরোধী ও বেআইনী শক্তি। তাই স্বৈরাচারীর দোসররা যেখানেই থাকুক, জনগন তাদেরকে দ্রুত পাকড়াও করে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
সময় খুব বেশি বাকি নেই।
।।।।।।। মোহাম্মদ হাই।।।০৬।১২।২০২৬।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।