04/01/2026
অনেকেই মনে করেন বন্ধ্যাত্ব একটি নির্দিষ্ট রোগ। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। আমার চিকিৎসা অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বন্ধ্যাত্ব মূলত শরীরের একাধিক শারীরিক ব্যবস্থার সম্মিলিত ভারসাম্যহীনতার ফল। হরমোন ব্যবস্থা, পরিপাকতন্ত্র, লিভার, রক্ত সঞ্চালন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘদিনের সমস্যাই ধীরে ধীরে প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শরীর যদি দীর্ঘ সময় অপুষ্টি ও বিষাক্ত খাবারের প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সন্তান ধারণের সক্ষমতা হ্রাস পায়।
বর্তমান সময়ে আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে নারী ও পুরুষ—উভয়ের মধ্যেই বন্ধ্যাত্বের সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তাই আমি সব সময় বলি, বন্ধ্যাত্ব সমাধানে সরাসরি ওষুধে যাওয়ার আগে প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরকে সন্তান ধারণের উপযোগী করে তোলা জরুরি।
এই ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ট্রান্স ফ্যাট (ক্ষতিকর কৃত্রিম চর্বি) এবং কৃত্রিম হরমোনযুক্ত খাবার প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার, স্বাস্থ্যকর চর্বি, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে ফার্টাইল হতে সহায়তা করে।
আমি রোগীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখি—ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি–কমপ্লেক্স, ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ঘাটতি থাকলে গর্ভধারণে সমস্যা হয়। এসব পুষ্টির অভাবে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে এবং ভবিষ্যতে শিশুর জন্মগত সমস্যার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
নারীদের বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলো দেখি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পিসিওএস (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম), অনিয়মিত মাসিক, ডিম্বাণু তৈরি না হওয়া, প্রোজেস্টেরন হরমোনের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন হরমোন। এসব সমস্যার সমাধান শুধু হরমোনের ওষুধে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের ভুল খাদ্যাভ্যাস ও অস্বাস্থ্যকর জীবনধারাই এসব সমস্যার মূল কারণ হয়ে থাকে।
আরেকটি বিষয় অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়—ইস্ট ইনফেকশন (Yeast infection) ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য। শরীরে দীর্ঘদিন ক্যান্ডিডা বা ইস্ট জাতীয় জীবাণু অতিরিক্ত বেড়ে গেলে প্রদাহ তৈরি হয়, হরমোন রিসেপ্টর ঠিকমতো কাজ করে না এবং ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘কারণহীন বন্ধ্যাত্ব’-এর পেছনেও এই সমস্যা দায়ী থাকে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়। কম শুক্রাণু সংখ্যা বা দুর্বল শুক্রাণুর পেছনে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জিঙ্ক ও সেলেনিয়ামের অভাব পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
আমি আরও লক্ষ্য করেছি, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব সরাসরি প্রজনন হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে। স্ট্রেসের কারণে শরীরে কর্টিসল নামের হরমোন বেড়ে যায়, যা সন্তান ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোনগুলোকে দমন করে।
তাই আমার পরামর্শ একটাই—শরীরকে আগে প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। ওষুধের আগে সঠিক খাবার, প্রয়োজনীয় পুষ্টি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরকে সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত করাই বন্ধ্যাত্ব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ পথ।
#বন্ধ্যাত্ব #সন্তান_ধারণ #নারীর_স্বাস্থ্য #পুরুষের_স্বাস্থ্য