11/11/2025
"বুদ্ধিজীবীরা কিভাবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছেন।"
এই বিষয়টি অত্যন্ত ব্যক্তিগত, গভীর এবং বহুমাত্রিক। বুদ্ধিজীবীরা কোনো একক পথে বা শুধুমাত্র যুক্তির মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পান না। বরং তাঁরা বিভিন্ন দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, আধ্যাত্মিক এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারেন।
সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যে প্রধান পথ বা যুক্তিগুলি দেখা যায়, তা হলো:
১. 💡 কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট (Cosmological Argument)
• যুক্তির ভিত্তি: এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুরই নিজে থেকে উৎপত্তি হওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি কারণ আছে, যা একটি আদিম কারণের দিকে নির্দেশ করে।
• উপলব্ধি: বুদ্ধিজীবীরা যুক্তি দেন যে, এই মহাবিশ্ব ও সময়ের শৃঙ্খলকে শুরু করার জন্য অবশ্যই একটি 'অ-কারণ প্রথম কারণ' (Uncaused First Cause) থাকতে হবে, যা সৃষ্টিকর্তা বা পরম সত্তা।
২. 🧠 টেলিলজিক্যাল আর্গুমেন্ট (Teleological Argument)
• যুক্তির ভিত্তি: মহাবিশ্বের অবিশ্বাস্য জটিলতা, সুনির্দিষ্ট বিন্যাস এবং প্রতিটি জিনিসের মধ্যে নিখুঁত উদ্দেশ্য (যেমন—চোখের কার্যকারিতা বা প্রকৃতির ভারসাম্য) কাকতালীয় হতে পারে না।
• উপলব্ধি: এই সুশৃঙ্খলতা ও নকশা (Design) প্রমাণ করে যে এর পেছনে একজন মহাজ্ঞানী নকশাবিদ (Intelligent Designer) বা সৃষ্টিকর্তা আছেন।
৩. ⚖️ নৈতিক বা মোরাল আর্গুমেন্ট (Moral Argument)
• যুক্তির ভিত্তি: মানুষের মধ্যে ন্যায়, অন্যায়, ভালো-মন্দ বা একটি মৌলিক নৈতিক চেতনার সর্বজনীন ধারণা বিদ্যমান। এই নৈতিকতা শুধুমাত্র সামাজিক রীতিনীতি নয়।
• উপলব্ধি: এই নৈতিক আইন একটি সর্বজনীন নৈতিক আইনদাতা (Universal Moral Lawgiver) বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের দিকে নির্দেশ করে।
৪. 🧘 ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা
• অনেক বুদ্ধিজীবী, যাঁরা শুরুতে সংশয়ী ছিলেন, তাঁরা গভীর ধ্যান, আত্ম-অনুসন্ধান, বা জীবনে কোনো মোড় ঘোরানো ঘটনার মাধ্যমে এক অলৌকিক বা তুরীয় উপলব্ধির সম্মুখীন হন।
• এই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত প্রমাণ হয়ে ওঠে।
৫. 📚 ঐতিহ্য ও ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান
• বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের গভীর ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ-এর মাধ্যমে অনেক বুদ্ধিজীবী ধর্মীয় সত্যের মর্ম উপলব্ধি করতে পারেন।
বিখ্যাত কিছু উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দার্শনিক সি.এস. লুইস (C.S. Lewis) যুক্তি এবং নৈতিকতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব দ্বন্দ্বের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন। আবার, অনেকে বিজ্ঞান ও প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে অনুভব করেন যে, জ্ঞানের সীমানার ওপারে অবশ্যই এক চরম সত্য বা পরম সত্তা বিদ্যমান।
সুতরাং, বুদ্ধিজীবীরা প্রধানত গভীর যুক্তিতর্ক, দার্শনিক অনুসন্ধান এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির সমন্বয়ে সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়ার পথে অগ্রসর হন।
মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহ্'র) অস্তিত্বকে কেবল অন্ধ বিশ্বাস বা ঐতিহ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করেন না, বরং গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, যুক্তি এবং দার্শনিক বিতর্কের মাধ্যমে এর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামী জ্ঞানচর্চার দুটি প্রধান ক্ষেত্র—ইলম আল-কালাম (ইসলামী ধর্মতত্ত্ব) এবং ফালসাফা (ইসলামী দর্শন)—এই অনুসন্ধানে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পেতে যে প্রধান যুক্তিগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
১. 📜 ইলম আল-কালাম ভিত্তিক যুক্তি (Dalil al-Huduth: মহাজাগতিকতার প্রমাণ)
ইলম আল-কালাম হলো ইসলামী ধর্মতত্ত্বের এমন একটি শাখা যা যুক্তি ও তর্ক ব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাসকে রক্ষা করে। এই ক্ষেত্রে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য দলিল আল-হুদুথ (Dalil al-Huduth) বা 'সৃষ্ট হওয়ার প্রমাণ' নামক একটি যুক্তি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়।
যুক্তির মূলনীতি: এই যুক্তি অনুসারে, এই মহাবিশ্ব ও এর সমস্ত উপাদান হলো হাদিস (Contingent) বা সৃষ্ট। কোনো সৃষ্ট বস্তু নিজে থেকে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না; এর জন্য একজন সৃষ্টিকর্তা প্রয়োজন।
উপলব্ধি: বস্তুর অস্তিত্ব সময়ের উপর নির্ভরশীল এবং ধ্বংসের শিকার হতে পারে। তাই এই জগতের শুরু করার জন্য অবশ্যই এমন এক সত্তা দরকার, যিনি নিজে অ-সৃষ্ট (Uncreated), অ-সীমাবদ্ধ (Non-contingent) এবং প্রথম কারণ (First Cause)—এটাই হলেন সৃষ্টিকর্তা।
২. 🧠 ফালসাফা ভিত্তিক যুক্তি (Wajib al-Wujud: আবশ্যিক সত্তার প্রমাণ)
ফালসাফা বা ইসলামী দর্শন, বিশেষত ইবনে সিনা (Avicenna)-এর মতো দার্শনিকদের মাধ্যমে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য আবশ্যিক ও সম্ভাব্য সত্তার (Proof of Contingency and Necessity) ধারণাটি ব্যবহার করে:
সম্ভাব্য সত্তা (Mumkin al-Wujud): এই মহাবিশ্বের সবকিছুই হলো 'সম্ভাব্য সত্তা'। অর্থাৎ, এগুলোর অস্তিত্ব থাকা বা না থাকা দুটোই সম্ভব।
আবশ্যিক সত্তা (Wajib al-Wujud): যেহেতু সম্ভাব্য সত্তাগুলো নিজেদের অস্তিত্ব নিজেরাই দিতে পারে না, তাই এই পুরো সম্ভাব্য জগৎকে অস্তিত্বে আনার জন্য অবশ্যই এমন এক আবশ্যিক সত্তা থাকতে হবে, যার অস্তিত্ব 'স্বয়ংক্রিয়' এবং 'অপরিহার্য'।
উপলব্ধি: এই আবশ্যিক সত্তাই হলেন আল্লাহ্, যাঁর অস্তিত্বের জন্য অন্য কারও বা কিছুর উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।
৩. 🌌 নকশা ও উদ্দেশ্যর প্রমাণ (Dalil al-Inaya: টেলিওলজিক্যাল আর্গুমেন্ট)
মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা মহাবিশ্বের নকশা (Design) এবং উদ্দেশ্য (Purpose)-এর দিকে মনোযোগ দেন, যাকে দলিল আল-ইনায়া বা নকশার প্রমাণ বলা হয়।
মহাজাগতিক সূক্ষ্মতা (Fine-Tuning): পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলি (Constants) যদি সামান্যতম ভিন্ন হতো, তাহলে মহাবিশ্বে প্রাণের সৃষ্টি সম্ভব হতো না। এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য কোনো মহাজ্ঞানী (All-Wise) সত্তার ইচ্ছাকে নির্দেশ করে।
সৃষ্টির শৃঙ্খলা: মানবদেহ থেকে শুরু করে সৌরজগতের আবর্তন পর্যন্ত সবকিছুর মধ্যে যে সূক্ষ্ম শৃঙ্খলা ও সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা বিদ্যমান, তা একটি সর্বজ্ঞ পরিকল্পনাকারীর অস্তিত্বের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।
৪. 📖 কুরআনিক পদ্ধতির ব্যবহার: 'তাফাক্কুর' ও 'তাদাব্বুর'
কুরআনের বহু আয়াতে মানুষকে সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন বা 'আয়াত' (Ayat) নিয়ে চিন্তা-গবেষণা (তাফাক্কুর) ও গভীর মনোনিবেশ (তাদাব্বুর) করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা এই নির্দেশকে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
তাফাক্কুর: এর অর্থ হলো প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনা (যেমন—বৃষ্টি, রাতের অন্ধকার, পাহাড়ের সৃষ্টি) নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।
উপলব্ধি: এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বুদ্ধিজীবীরা অনুধাবন করেন যে, সৃষ্টিকর্তা এই সৃষ্টিতে তাঁর শক্তি, জ্ঞান এবং ইচ্ছার ছাপ রেখেছেন। অর্থাৎ, তাঁর সৃষ্টিকর্মই তাঁর অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ।
সংক্ষেপে, মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের কাছে সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াটি কেবল বিশ্বাসের নয়, বরং যুক্তির মাধ্যমে বিশ্বাসের সত্যায়ন (Confirmation of faith through reason)। তাঁরা মনে করেন, যুক্তি ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একটি অন্যটিকে পূর্ণতা দেয়।