05/01/2026
একটা মেয়ে ছিল । বদ্ধ উন্মাদ মেয়ে । ভারতবর্ষের এক শহরে আদিগঙ্গার কোলে জন্ম নিয়েছিল সেই বালিকা..বেড়ে উঠেছিল টালির চালের ছোট্ট বাড়িটায় । খুব ছোট বয়সে বাপ হারায় পাগলিটা । কালক্রমে সেই মেয়েরই রাজনীতিতে প্রবেশ আর ভয়ানক যুদ্ধের ইতিহাস.. সে এখন সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী । জানেন তো, অনেক দিন ধরে লক্ষ করছি। তবে এই বদ্ধ উন্মাদটা যে এভাবে মানুষগুলোকে আপন করে নেবে, স্বপ্নেও ভাবিনি..
পেটেই মেয়ে গুলোকে মেরে ফেলা হত । সৌভাগ্যবসতও যেই কজন গর্ভগুহার বহির্বিশ্ব দেখতে সক্ষম হত তাদের মধ্যেও কিছু কন্যা হয় স্বশুরবাড়ির অত্যাচার কিংবা নিজ মা-বাবার দ্বারা পাচার হয়ে জীবনে দাঁড়ি কাটত । এখন এত কিছু প্রতিকূলতার পরেও যে কজন কন্যা সাধারন জীবনযাপন করতেন তাদের মধ্যেও অধিকাংশকেই প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডির বাইরেই রাখা হত । সোজা ভাষায় মেয়েরা ছিল এক একটা "loss" । জন্মের পরবর্তী খরচ,বিয়ের খরচ তার উপর আবার পড়াশোনা ? ভাবলেই ভিমড়ি খেতেন মা বাবারা !
ব্রহ্মদেবাশিষে প্রতিষ্ঠিত হল বস্তির মেয়েটার সরকার। হাওয়াই চটির খট খট শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল মহাকরনের "chief Minister's office' । সেই প্রথম, যখন বিকালের মহাকরনে স্যুপ,স্যান্ডউইচের গন্ধ মুছে মুরি বেগুনী ম ম করতে লাগল । রাত অবধী আলো জ্বলতে লাগল প্রশাসনিক প্রধানের কক্ষে। মহাকরনে ঘর মুছত,ঝাড় দিত ছেলেটা বলছিল, বস্তির মেয়েটা নাকি স্বভাবসিদ্ধভাবেই গদির কেদারায় বসে না ! ও যে দোকানে চুল কাটতে যায়, সেই বুড়োদার কাঠের চেয়ারটাও নাকি "ছোটলোক" টার চেয়ারের চেয়ে আরামদায়ক ! একদিন নাকি ছেলেটার গ্যাসের যন্ত্রনা উঠেছিল, ছোটলোকটা নাকি নিজের ব্যাগ থেকে একটা rantac tablet বার করে খাইয়ে দিয়েছিল ! এও হয় ? শুনে বিশ্বাস হয়নি.. সেই প্রথম হয়ত, Designation -এ Chief minister কোনও ব্যক্তি পাতি একটা চারচাকায় উঠে যাওয়া আসা করত ! একদিন দেখলাম,মহাকরনের সি গ্রেড কর্মীর গাড়িটাও ওর টার চেয়ে ঝাঁ চকচকে ! সত্যিই ! বস্তির মেয়েই বটে !
এসেই ঝপাত করে একটা decision..কন্যাশ্রী না কী যেন নাম,একটা প্রকল্পের কেঁচো মাথায় গিজগিজ করছিল, উগরে দিল খাতায়-কলমে-মাটিতে। গগনে বিরাজমান বিমান-সূর্য্যিদেবরা ব্যঙ্গ করতে ছাড়লেন না । যতই হোক, কোথায় বস্তির মেয়ে আর কোথায় তেনারা ! একটা ছোটলোকের বুদ্ধির কীইবা জোর আছে শুনি ? Bu****it প্রকল্প !
যাই হোক, ছোটলোকের brain child মেঠো পথ পেরিয়ে ছুটে চলল চাষি কন্যার কাছে, শ্রমীক কন্যার কাছে । আগলে ধরল এদের । চাষির মেয়ে টুম্পা কনাশ্রীকে জিজ্ঞেস করল, "কে তুই ? কে তোকে পাঠাল ? কি কাজ তোর ?" কন্যাশ্রী উত্তর দিল, "সারে সাতশ বছরে দেব,আঠারোয় পঁচিশ হাজার । বাপকে বল পড়িয়ে যেতে । বস্তির মেয়ে পাশে আছে ।" টুম্পা বলল, "কে বস্তির মেয়ে ? কার কথা বলছ ?" কন্যাশ্রী বলল, "ও সে এক আছে । বড় ছোটলোক গো । সে সব নয় পরে জানবে, এখন পড়তে বসো দেখি.. ও হ্যাঁ, শুনলাম বাপ নাকি বিয়ে দেবে ? কাল তোমায় দেখতে ছেলে আসছে ? বাপকে না বলে দাও আজই । বুঝলে ?" ঘাড় নেরে সন্মতি জানাল টুম্পা ।
তখন সালটা ছিল ২০১২ । আজ পাঁচ বছর পর টুম্পা ম্যাথামেটিক্সে MSc করছে । মেধাবী মেয়েটার পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই হাতের মুঠোয় চাকরির অফার। আজও টুম্পা ভাবে, সব তেমনই চললে আজ হয়ত ওর দুই সন্তানের মা' হয়ে যাওয়ার কথা ছিল..কারোর ঘরে নিজের মায়ের মতই শখ,আল্হাদের গলা টিপে,গতর ঝড়িয়ে একটু একটু করে মরে যেতে হত ওকে।
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের হিসাব দেখলাম,গত পাঁচ বছরে অভাবনীয় হারে বেড়েছে মহিলা মাধ্যমিক পরিক্ষার্থীর সংখ্যা..বাপ মা আজ মেয়ের বিয়ের চিন্তা করছে না.. পঁচিশ হাজারের লোভে হোক কিংবা চেতনার উন্মেষে, বস্তির মেয়েটা revolution এনে দিল দেখছি !
যাই হোক, আবার সেই সময়ে ফিরে যাই ছোটলোকটার গল্পে । ২০১১র পর কীভাবে জানিনা, গোটা লালবাড়িটাই বাবুয়ানার পর্বতপ্রমান উচ্চতা ছেড়ে মাটিতে নেমে এসেছিল ! বস্তির মেয়ের কি আর মার্বেল পাথর সুট করে ?!
এরপরেই হঠাৎ খেয়াল করল, রাজ্যের দুটো জায়গা বড় গরম হয়ে উঠেছে। দার্জিলিং এ রাজ্য ভাগের দাবীতে বন্ধ,হরতাল সীমানা ছাড়িয়েছে, এদিকে জঙ্গলমহলে রোজ দু'টো করে লাশ, বোম-গুলি । গামছা ঢাকা মুখের শাসনে বেসামাল বাঁকুরা থেকে মেদিনীপুর । স্যুট,বুট,পাঞ্জাবি পরা বাবুরা টনটনে ফোঁড়া রেখে পালিয়েছেন। দায়টা এখন ছোটলোকের । কী করা যায় ? এই ভেবে আরও কয়েকটা বেগুনীতে কামড় দিল বদ্ধ উন্মাদটা।
সব কাজ কি মেরে ধরে হয় ? মা বলত, আমরা নাকি যখন ছোট ছিলাম,অনেক কাজ আদর করে করিয়ে নিত আমাদের দিয়ে । পাগলিটাও যে মায়ের মত ভাবছে কে জানত ? লক্ষ্য করলাম, গামছা ঢাকা মুখ সৃষ্টির কারন খুঁজে ও বলল, "পেটে ভাত পড়লে বন্দুক ফেলে দেবে ওরা, শীতে মোটা কম্বল পেলে আর বোম বাঁধবে না.." । সত্যিই তো ! এই সরল ভাবনাটা বাবুদের মাথায় আসেনি কেন ? ঠিকই তো ! অন্নের দাবীতেই তো হাতে বন্দুক উঠেছে ওদের । পিঁপড়ের ডিম খাইয়ে বউ,বাচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ওই ইংলিশ মিডিয়ামের বাবুরা বুঝত হাতে বন্দুক কেন ওঠে !
ছোটলোকটা গাঁমছা সরিয়ে মুখে অন্ন তুলে দিল । স্বাস্থ্যের জন্য হাসপাতাল গড়ে দিল। সন্তানদের স্কুল,বুট,সাইকেল দিল। তারপর একদিন বীরদর্পে ঘোষনা করল, সে পথ ছেড়ে যারা মূলস্রোতে ফিরতে চাইবে, আমরা তাদের পাশে আছি ।
ব্যাস । কাজ শেষ । এখন ওখানে আর লাশ মেলে না । বোম মেলে না, used bullet মেলে না.. গামছার কাজ শুধু গা মোছাতেই ফিরে এসেছে ! কি অদ্ভুত ! ভাবলেও অবাক লাগে ! বদ্ধ উন্মাদটার মাথায় এত বুদ্ধি ?
এরপর এল দার্জিলিং । ওষুধ একই প্রয়োগ হল । বঞ্চিত পাহাড় উন্নয়নের স্বাদ পেল। 'সমতল বনাম পাহাড়'-এর চেনা বাক্য গুঁড়িয়ে তিনি বললেন, "পাহাড় এবং সমতল" । আচ্ছা, এত সরল কথা বলেই কি জটিল ব্যক্তিরা এতদিন আসল রোগটা ধরে উঠতে পারেননি ? যা কিনা বস্তির মেয়েটা ধরে ফেলল ? ছ্যা ছ্যা..ছ্যাঃ !
এভাবেই সময়ের চাকা গড়াতে লাগল। একসময়ে নাগাল না পাওয়া ক্যাবিনেট নেমে এল ঘাসের উপর। উন্মাদটা কলকাতাকে বগলদাবা করে নিয়ে পৌঁছে গেল বীরভূম,পুরুলিয়া কিংবা জলপাইগুড়ির বস্তি,কলোনী,গ্রামে।ভগ্ন পথ মসৃন হল। হাতের কাছে উঠে এল কলেজ, হাসপাতাল কিংবা পানীয় জলের স্বচ্ছ ধারা। রোগা,জীর্ণ মানুষগুলো বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়ে সজীব হয়ে উঠল। স্বাধীনোত্তর অন্ধকার গ্রামে আলো জ্বলে উঠল..
আর কত বলব ? সে বিশাল পরিবর্তন.. প্রথম দিন মহাকরনের আলো অত রাত অবধী জ্বলতে দেখেই টের পেয়েছিলাম এমন কিছু একটা হবে....আজ বুঝি,ভাবনা একদমই ভূল ছিলনা । আজকের সালটা ২০২৬। গত বারে ছোটলোক উন্মাদটাকে সর্বহারার দল আবার ফিরিয়ে এনেছে তাদের সেবা করাতে। আরও বেশি আশীর্ব্বাদ করে..কিন্তু এটা কি উপায় সম্ভব !
মাঝে মধ্যে আবার লক্ষ্য করতাম, ওর ছোট ছোট ভূল গুলোকে নিয়ে বেশ রঙ্গ তামাশায় মেতে যেত elite-কূল। কয়েকদিন আগেই দেখলাম, মুখ ফষ্কে দেড় হাজার গ্রামের শিশুকে দেড় হাজার কিলো বলে ফেলেছিল ! আমিও মিচকে হেসেছিলাম, তবে তা নিয়ে ব্যঙ্গ করার কথা ভেবেও দেখিনি। কত 'কাঁধে ঝোলা-লাল পোলা' ফেসবুকে স্ট্যটাস মারল, এই সাধারনজ্ঞান নিয়ে রাজ্য চালাচ্ছে ! রাজ্যটা নাকি রসাতলে যাবে ! ভাবলাম ওদের জীজ্ঞেস করি, হ্যাঁ রে ? যে ন্যয্যমূল্যের দোকানে লাইন লাগাস সেটা কার সাধারনজ্ঞানের অভাব থেকে সৃষ্টি বলতে পারিস ? তোদের বাড়ির মেয়েটা এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিট হেঁটে স্কুল যেত, আজ শুধু চল্লিশ মিনিটে যায়..শীতকালে আলো থাকতেই ঘরে ফিরে আসে,তা এই নীল সাদা বিশ্বকর্মা সাইকেলটা কার সাধারনজ্ঞানের অভাব থেকে সৃষ্টি রে ভাই ? যে গাঁয়ের বাড়ি থেকে ফেসবুকে বাতেলা মারছিস, এই উন্মাদটা না চাইলে দু হাজার বারো সালে তোর ঘরে ইলেকট্রিকের তার পৌঁছত ? চার্জের প্ল্যাগটা কোথায় গুঁজতি 'সাধারনজ্ঞান' apply করে ভেবে রেখেছিলি তো ??
প্রতি মূহুর্তে যখন এসব দেখি,বুকে বড় ব্যথা হয়। তার পর মূহূর্তেই আবার ভাবি, এই দু পাঁচ জনের কথায় কীই বা এসে গেল ? আপামর সর্বহারার বুকে তো ছোটলোকটাই বিরাজ করে আছে। চিন্তা কিসের ? হরি যদি জনগন, মারে কে ?
এদিকে কিছু লোকের গুনগুন শুনতে পাচ্ছি । বস্তির মেয়েটা নাকি বড় বার বেরেছে।
বাড়ুক মেয়েটির স্পর্ধা , কর্মের পরিধি।
আজ সেই বস্তির মেয়েটির জন্মদিন। শুভ জন্মদিন অগ্নিকন্যা।
কলমে- দেবাংশু