06/02/2026
কলমে: Raihan Khan
গতকাল রাত ৩.৪০। সব কাজ গুছিয়ে রেস্টে গেছি। চোখ লেগে এসেছে। এরমধ্যেই দরজায় নক। দেখি এক ৬০ বছর বয়সী হিন্দু ভদ্রলোককে ট্রলিতে করে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রচণ্ড বুকে ব্যথা।
ইসিজিটি দেখে ভ্রু কুঞ্চিত হলো। একিউট এসটি-ইলিভেশান মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশান (এক্সটেন্সিভ এন্টেরিয়র)। বড়ো ধরনের হার্ট অ্যাটাক।
এমন ইসিজির আলাদা একটি নাম আছে। এখানে এসটি সেগমেন্ট দেখতে অনেকটা Tombstone-এর মতো দেখায়। এর বাংলা হবে সম্ভবত সমাধিপ্রস্তর বা কবরফলক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কবরে দেখা যায়। মৃত ব্যক্তির নাম, জন্ম-মৃত্যুর তারিখ ইত্যাদি লেখা থাকে।
এই ভদ্রলোকের ইসিজিটিতে Tombstoning ST-segment elevation ছিল। ছোটোদের বোঝার সুবিধার্থে একটি নমুনা ইসিজি সংযুক্ত করলাম।
তাবৎ বইপুস্তকে লেখা আছে এই ধরনের রোগীদের মৃত্যু হার অনেক বেশি। অন্য যেকোনো হার্ট অ্যাটাকের চেয়েও এই রোগীর খারাপের দিকে চলে যাবার সম্ভাবনা প্রকট। এটাই মূলত ভ্রু কুঞ্চিত হবার কারণ।
তবে আল্লাহর রহমতে এমন অনেক রোগীর ভালো হবার অভিজ্ঞতা আছে আমাদের। দ্রুত লোডিং ডোজ দেওয়া হলো। থ্রম্বোলাইসিস রেডি করে ফেলা হলো। এখনই দেওয়া হবে। ঠিক সেই মুহূর্তে পেশেন্ট কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে চলে গেলেন।
কালবিলম্ব না করে সিপিআর শুরু করা হলো। মনিটরে শকেবল রিদম ছিল না। অনেকক্ষণ সিপিআর কন্টিনিউ করা হলো, অ্যাড্রেনালিন কয়েকবারই পেলো।
পাঠক, অন্য অনেকদিনের মতো আজ আপনাদের আশাব্যঞ্জক কিছু আর শোনাতে পারলাম না। ইসিজি ফ্ল্যাট লাইন চলে এলো। আমাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি বিদায় নিলেন।
রোগীর দুই ছেলে। একজনের বয়স ২৫/৩০ হবে। আরেকজনের ১৫/১৭। আমি বড়োজনকে ডেকে বুঝিয়ে বললাম। তিনি বুঝলেন। আমাদের সকল প্রচেষ্টাই তো তিনি দেখেছেন।
এই লেখাটি কেন লিখছি তা এখন বলি।
ছোটো ছেলেটি কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এলেন। আমি যখন সিপিআর দিচ্ছিলাম সে এক ধ্যানে বাবা বাবা ডাকছিল। বাবা কথা বলো।
ছেলেটি এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। আমাকে বলছে, স্যার, একটু 'ছট' দিয়ে দেখেন না। কী বললেন? ঐ যে কারেনে ছট। মেশিনটা দিয়ে।
আমি বুঝতে পারলাম সে ডিফিব্রিলেটর দিয়ে 'শক' দিতে বলছে। হয়তো সে টিভিতে বা মুভিতে দেখেছে এমন শক দিলে রোগীরা অনেক সময় ভালো হয়। হ্যাঁ, তা তো হয়ই। কিন্তু ভদ্রলোক আরও কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে। ইসিজিতে সম্পূর্ণ ফ্ল্যাটলাইন। কী যে উত্তর দেব। পৃথিবীতে কোনো ভাষায় কী সেই শব্দভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে।
এই কথাটা আমার কানে বাজছে। স্যার একটু কারেনের ছট দিয়ে দেখেন না।
আমার ডিউটির সবচেয়ে বেদনার অংশটুকু হচ্ছে, যখন ডেকে ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হয়। এরচেয়ে কঠিন কাজ এই জগত-সংসারে আর নেই। আর এই কাজটিই আমাদের নিয়মিত করতে হয়।