10/12/2025
প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অন্ধকার দুনিয়া— আমরা কবে মুক্ত হবো?
দৃশ্য ১:
“ডাক্তারবাবু, এত কষ্ট করে আপনাকে পেশেন্ট এনে দিলাম, আর আপনি মাত্র দুটি ওষুধ লিখেই ছেড়ে দিলেন? কয়েকটা ভিটামিন, গ্যাসের ওষুধ তো লিখুন! না হলে আমার দোকানই চলবে কীভাবে?”
দৃশ্য ২:
“স্যার, একটা CBC, FBS, PPBS অন্তত লিখে দিন না… নাহলে আমার ল্যাব চালাবো কীভাবে? এতগুলো স্টাফের বেতন দেবো কী দিয়ে?”
দৃশ্য ৩:
“স্যার, এই পেশেন্টটা নরমাল ডেলিভারি করতে চাইছে। ওকে একটু ভয় দেখিয়ে সিজার করে দিন। এতে আপনারও লাভ, আমারও লাভ।”
দৃশ্য ৪:
“এটা ডাঃ রায়ের পেশেন্ট। ও বলেছেন hysterectomy করতে হবে। স্যার, আপনি করে দিন— আপনার ৭০%, আমার ৩০%। পেশেন্ট বলছে বয়স ৩৫, তাই অপারেশন করাতে চাইছে না… স্যার, একটু ক্যান্সারের ভয় দেখিয়ে OT করে ফেলুন।”
দৃশ্য ৫:
“স্যার, এই যে আইরন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন— এগুলো আমার কোম্পানির। একটু লিখে দিন… লিস্টে রাখলে খুব সুবিধা হয়।”
দৃশ্য ৬:
“স্যার, USG-তে একটু ‘bulky uterus’ লিখে দেবেন? তাহলে সার্জনদের অপারেশন করাতে সুবিধা হবে।”
দৃশ্য ৭:
“স্যার, মালিককে তো বলেছি— আপনার নামেই তো এত পেশেন্ট ভর্তি করছি। ডাক্তার ঘোষ আমাদের কিছু দেন… আপনি তো কিছুই দেন না!”
দৃশ্য ৮:
“একটা সিজার করে চার হাজার নেবেন? প্রফেসর চৌধুরী— তিনি আপনার চেয়ে অনেক বড় সার্জন—প্রফেসর হয়েও উনি তো দুই হাজার নেন!”
দৃশ্য ৯:
“স্যার, কোম্পানি আপনার tenure আর renew করছে না। আপনার থেকে আমাদের প্রত্যাশিত business আসছে না।”
দৃশ্য ১০:
“স্যার, ১২ বছরের অবিবাহিতা মেয়ের ২৫ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সি। ওর বাবা-মা কাঁদছে। ১০ হাজার টাকা দেবে। একটু ‘wash’ করে দিন। আমরা তো আছি… কোনো সমস্যা হবে না।”
দৃশ্য ১১:
“স্যার, তিনজন পেশেন্টের সব টেস্ট করিয়ে পাঠালাম। দয়া করে ওই ওষুধগুলিই লিখে দিন— আমাদের দোকান থেকেই যেন কেনে।”
দৃশ্য ১২:
“স্যার, হাতের লেখা এত পরিষ্কার কেন রাখছেন? পেশেন্ট অন্য দোকান থেকে ওষুধ কিনে নিচ্ছে! শর্ট-এ লিখুন… আমরা দিয়ে দেবো।”
—------------
এগুলো সবই ডাক্তারদের সঙ্গে দালাল, কোয়াক, ওষুধ কোম্পানি, ল্যাব মালিক, নার্সিং হোম ম্যানেজার— এদের নিত্যদিনের কথোপকথন। প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বাস্তব চিত্র। আমাদের প্রায় সকলেই এই দৃশ্যগুলো দেখেছি, শুনেছি, বা কোনো না কোনো ভাবে অনুভব করেছি।
কেউ কেউ এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে মার্কেটে জায়গা করে নেয়।
আর যারা নীতিতে অটল থাকতে চায়— তাদের পথটা হয় অনেক কঠিন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
🔥 এই সংস্কৃতি কবে বদলাবে?
🔥 আমরা ডাক্তাররা কেন এই “ইঁদুর দৌড়ে” নিজেদের নামিয়ে দিই?
🔥 আমরা কি না খেয়ে মরছি?
🔥 নাকি লোভ এবং প্রতিযোগিতা আমাদের বিবেককেই গ্রাস করে নিচ্ছে?
আজ দালালদের রাজত্ব, কোম্পানির চাপ, ল্যাবের টার্গেট, নার্সিং হোমের ব্যবসা— সব মিলিয়ে একটি অনিরাপদ ও অবমাননাকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কার?
রোগীর।
আর দ্বিতীয় ক্ষতি— আমাদের চিকিৎসক সমাজের সম্মান।
আমাদের মধ্যে কেউ দুই হাজার টাকায় সিজার করছেন, আবার কেউ দালালকে ৩০% দিয়ে দিনে চারটি অপারেশন করছেন—
এ যেন বিবেকহীন প্রতিযোগিতা।
মানুষের জীবনের উপর কৌশল, ভয়, অসত্য ব্যবহার— সবই “নিয়ম” হয়ে দাঁড়িয়ে
আমরা কি সত্যিই চিকিৎসার পবিত্র পেশাকে ব্যবসার বাজারে নিলামে তুলে দেব?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।
পরিবর্তন আমাদের থেকেই শুরু হবে।
✍️ ©️ডঃ মহঃ মফিজুল মন্ডল