22/03/2026
শ্রী সাগ্নিক সিনহা লিখছেন.....
" স্যার, আগে ভালো ছিলাম। ওই বছর পাঁচেক আগে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেই হার্টের রোগ ধরা পড়ল"
"ডাক্তারবাবু, জীবনে কোনোদিন ওষুধ খাইনি। কেন মরতে কি কুক্ষণে ওই করোনা ভ্যাকসিন নিলাম, তারপর থেকে সেই যে ব্যথায় ধরল, হাঁটু কোমর আর সোজা করতে পারিনা মোটে"
ছোট্ট দুটো উদাহরণ। ক্লিনিকে প্রত্যেকদিনই অন্তত একজন হলেও রোগী থাকে যে তার আপাত স্বাভাবিক বয়সজনিত পরিবর্তন বা ক্রনিক রোগের উৎপত্তি অর্থাৎ প্যাথোজেনেসিস ব্যাখ্যা করে ফেলে কোভিশিল্ড বা কোভ্যাক্সিন দিয়ে। অথচ কেউ ভাবে না, তাহলে এই যে কোটি কোটি মানুষ গোটা দেশে,এবং বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ গোটা দুনিয়ায় ভ্যাকসিন নিল সবারই কেন হার্টের রোগ, কিডনির রোগ, বাতের ব্যথা, নার্ভের অসুখ ধরল না? ভ্যাকসিন কি বেছে বেছে বানানো হয়েছিল কিছু লোকের জন্যে ?
ব্যাপারটা আসলে কিছুটা নতুন জিনিসের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক ভীতি এবং hesitation, যেটা সম্প্রতি cervical cancer এর প্রতিরোধে চালু করা HPV ভ্যাকসিনেশনের ক্ষেত্রেও বিরাট মাত্রায় দেখা গেছে, এমনকি "উন্নত, বিজ্ঞান সচেতন দেশ" আমেরিকাতেও ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলন হয়েছে!!!
অথচ, WHO, CDC, FDA সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নামকরা স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার দেখিয়ে দিয়েছে যে এই টিকাগুলি বাজারে ছাড়ার আগে তাদের সমস্ত সাইড ইফেক্ট খতিয়ে দেখেই নিশ্চিন্ত হয়ে সুরক্ষার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষ গবেষণালব্ধ তথ্যের চেয়ে "পাশের বাড়ির ওর হয়েছিল" বা " সেদিন ফোনে দেখছিলাম" জাতীয় তথ্য বেশি ভালোবাসে।
আর বাকিটা?
Diagnostic phalacy বা যাকে বইয়ের ভাষায় বলে বার্কসোনিয়ান বায়াস এবং detection bias...
অর্থাৎ খুঁজেছি তাই পেয়েছি, পেয়েছি তাই জেনেছি, না খুঁজতে এলে জানতেই পারতাম না। এই bias টি , একটি কগনিটিভ বায়াস, কারণ এর সৃষ্টি আমাদের মনে, চেতনায়, কল্পনায়।
আমাদের চারিদিকে সর্বত্র। আমাদের জীবনের অনেক বড় বড় সিদ্ধান্তে এই bias এসে কলকাঠি নাড়ছে। বিষয়টা সোজা। আপনি হাসপাতালে গেলেই আপনার মনে হবে, " বাবারে বাবা এত্ত অসুখ চারিদিকে! রোগের ডিপো যাকে বলে। বেঁচে থেকে লাভটা কি? সবাইকে তো ওষুধ দিয়ে জিইয়ে রাখা হয়েছে যেন!", একজায়গায় সব অসুখকে হঠাৎ দেখছেন বলেই আচমকা আপনার ভীতি এবং সচেতনতা মারাত্মক ট্রিগার করে যাবে। অনেকেই হাসপাতালে কোনও কারণে ভর্তি হলে, বাড়ি ফেরার পর থেকে বিশেষ ভাবে স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে পড়েন। সেটা স্রেফ বুদ্ধি জেগে ওঠার ফলে হয় না, হাসপাতালের ভীতিপ্রদ অভিজ্ঞতার কারণেই বেশি হয়।
কোনো বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে যদি আপনি সমীক্ষা করেন তাহলে সেই জিনিসটি উপস্থিত আছে এমন জায়গায় যেমন ঘুরতে হবে তেমনি, জিনিসটি আদৌ নেই তেমন জায়গাগুলোতেও ঘুরে দেখতে হবে। তবেই বোঝা যাবে, বিষয়টি সত্যি থাকার সম্ভাবনা কতটা।
কোভিড ভ্যাকসিনের সাথে যাঁরা রোগের সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন, তাঁদের সম্ভাব্য ইতিহাসটা হয় এইরকম।
1. ব্যস্ত মানুষ, নিজের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই বা ইচ্ছে নেই। বাড়ির লোকের শরীর খারাপ নিয়ে হয়তো তাও ব্যতিব্যস্ত থাকেন কিন্তু নিজের ছোট খাটো উপসর্গ থাকলে সেগুলো চেপে যান, উড়িয়ে দেন। স্বাস্থ্যের প্রায়োরিটি বলতে কিছু নেই তাঁর কাছে। স্বাস্থ্যখাতে পয়সা খরচ করাটা বেকার টাকা জলে ঢালা মনে করেন, তাই ভুলেও ডাক্তারের কাছে যান না।
2. করোনা আক্রান্ত হওয়ার ফলে নাভিশ্বাস ওঠায় বাধ্য হয়েই ডাক্তার দেখাতে হল, বা দুর্ভাগ্যবশত হাসপাতালে ভর্তি হতে হল।
3. করোনার চিকিৎসার খাতিরেই এবার যাবতীয় রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, স্ক্যান সবই হল, ডাক্তারবাবু শরীরের ক্লিনিকাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন। এবং রোগী জানতে পারলেন যে উপরে ফিট দেখালে কি হবে, ভিতরে ভিতরে তাঁর কলকব্জা খুব একটা সুবিধের জায়গায় নেই।
4. নিজের গাফিলতি এবং অবহেলা স্বীকার করা খুব মুশকিল, নিজেকে বোকা দেখানো কেউ পছন্দ করে না। ফলে রোগ ধরা পড়ার পিছনে কারোর একটা ঘাড়ে দোষ চাপানো দরকার। কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে মাথায় এল, তাই তো, আমার করোনা হয়েছিল তারপরই এইসব ধরা পড়ল। আর করোনার আগেই/ ওই সময় ভ্যাকসিন নিয়েছিলাম, সেই ভ্যাকসিন নিয়ে লোকে কত কি বলছিল, ফেসবুকে কি সব লিখছিল। তার মানে, হ্যাঁ, একদম জলের মতো পরিষ্কার।
কোভিড ভ্যাকসিনই আসলে মানুষ মারে। এটা হচ্ছে temporal association, অর্থাৎ একই সময় ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে না পারলে ওই দুটোই একটার থেকে আরেকটা হয়েছে বলে জুড়ে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে কি হয়?
1. হার্টব্লক ও অন্যান্য হার্টের অসুখ, কিডনির পাথর, নার্ভের অসাড় ভাব/ শিরশিরানি, প্রেশার, সুগার, হাঁটু কোমরের বাত, শিরদাঁড়ার ক্ষয়, ঘাড়ে ব্যথা এইসবই প্রত্যেকটা ক্রনিক অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি ধীর গতির অসুখ। বহু বছর ধরে একাধিক ক্ষতিকর ফ্যাক্টরের জটিল interaction এর কারণে একটু একটু করে শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপ পাল্টে গিয়ে এইসব অসুখ ডেকে আনে। চিকিৎসা না করলে ছোটোখাটো পরিবর্তন গুলো ক্রমশ বড় ধাক্কা হয়ে ওঠে, এবং হঠাৎ একদিন মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে রোগীকে শুইয়ে ফেলে।
2. কোভিডের সময় কোভিড আক্রান্ত হওয়ার কারণেই হোক বা ওই সময়ে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া স্বাস্থ্যভীতি, মৃত্যুভয়ের কারণে বহু মানুষ নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, রুটিন টেস্ট করা ইত্যাদি শুরু করেন। ফলে এতদিন ঘাপটি মেরে থাকা অসুখ চোখের সামনে এসে।
3. যেকোনো সংক্রমণ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বেশ ভালোমত নাড়া দিয়ে যায়। বিশেষ করে ভাইরাস সংক্রমণের পর post viral inflammation অর্থাৎ সংক্রমণ পরবর্তী প্রদাহ দেখা যায়। ভাইরাসকে নির্মূল করতে শরীর যে প্রচুর প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক এবং ঘাতক কোষ তৈরি করে তাদেরই collateral damage এইটা (মারামারি থামাতে গিয়ে নিজেই মাঝখানে পড়ে চড় থাপ্পড় খেয়েছেন কখনও? তাহলে বুঝতে পারবেন)। এর কারণে শরীরে প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে অস্বাভাবিক চাপ পড়ে এবং ইতিমধ্যেই ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা ওইসব ক্রনিক রোগের ট্রিগারের মত কাজ করে। ফলে, সাময়িক উপসর্গ জেগে ওঠে। হার্টের রোগীর বুকে চাপ লাগা, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বয়স্ক মানুষের হাঁটাচলা করতে গেলে হঠাৎ বেশিই ব্যথা করে হাঁটু, কোমর (post viral arthritis) ইত্যাদি। এই পোস্ট ভাইরাল ট্রিগার খুব বেশি হয়ে গেলে সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে নির্দিষ্ট ওষুধ, চিকিৎসা আছে।
কিন্তু এটা নিজে অসুখ ডেকে আনছে না। এর সাইড ইফেক্ট অনেকটা ফায়ার অ্যালার্মের মত, অর্থাৎ আপনার বাড়িতে কোথাও সবে গ্যাস লিক শুরু হচ্ছিল কিন্তু আপনি জানতেনই না, হঠাৎ করে কেউ দেশলাই জ্বালিয়ে ফেলল। খানিক হাত পুড়ল বটে কিন্তু প্রাণে বেঁচে গেলেন।
এবং এই ট্রিগার কিন্তু অসুখটার কারণেই বেশি, ভ্যাকসিন থেকে তত বেশি না।
বরং এভাবে ভাবুন, ভ্যাকসিন থেকেই হোক বা কোভিড থেকে, রোগটা অন্তত সামনে তো এল! ওষুধপত্র শুরু করা গেল, আপনি সাবধান হয়ে গেলেন। কে বলতে পারে, নাহলে একেবারে পঙ্গু করে দেওয়ার পর্যায়ে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করতেন, আপনি গত বিশ বছর ধরে অসুস্থ।
আর ভ্যাকসিনটা না নিলে আজকে আদৌ এইসব কথা ভাবার বা পড়ার জন্যে জীবিত থাকতাম আমরা এইটাই বা কে গ্যারান্টি দেবে? সেই ভয়াবহ মৃত্যুমিছিলের স্মৃতি তো সবার মনেই এখনও দগদগে টাটকা।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, শরীরের যত্ন নিন।
নিজেকে সুপারম্যান বা ওয়ান্ডার ওম্যান ভাবা বন্ধ করুন, "আমার কিছু হয় না" এই delusion থেকে বেরিয়ে আসুন সত্ত্বর।
চল্লিশ পেরনোর পর বিশেষ করে খেয়াল রাখুন, ছোটোখাটো পরিবর্তন বা উপসর্গও হেসে উড়িয়ে দেবেন না। সুস্থ আছেন মনে হলেও preventive measure হিসেবেই বছরে একবার দুবার ডাক্তার দেখান, একটা দুটো সামান্য রুটিন টেস্ট করান চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে। জল, খাবার, হাঁটাচলা নিয়ে যত্নবান হন। এইটুকুই।
©DrSagnik.