19/02/2026
তন্ত্রের পঞ্চ-ম-কার সাধনা আসলে কি?
==============================
তন্ত্রে মহাদেব পঞ্চ-ম-কার সাধনার কথা উল্লেখ করেছেন। এই পঞ্চ-ম-কার সাধনায় সাধকের অতুল সিদ্ধি লাভ হয়, পুনর্জন্ম হয় না। কিন্তু বর্তমানে Podcast ও Social Media এর যুগে এই পঞ্চ-ম-কার নিয়ে নানা ভ্রান্ত ধারনার প্রচার করা হয় এবং তন্ত্র সাধনার আড়ালে ব্যাভিচার চলে। বর্তমানে তন্ত্রের পঞ্চ-ম-কার ভুলভাবে কেবল স্থূল ভোগ বা কামাচার হিসেবে পরিচিত, যা আসলে আধ্যাত্মিক সাধনার উচ্চতর রূপ। পঞ্চ-ম-কার মানে মদ্যপান করা, মাংস ভক্ষণ করা, মাছ খাওয়া, মুদ্রা/ভঙ্গি ব্যবহার করা এবং যৌন মিলন নয়। দেবীকে যে কোন কিছু ভোগ স্বরুপ উৎসর্গ করে প্রসাদের নামে নিজেদের রসনা তৃপ্তি করার নাম তন্ত্র সাধনা নয়।
আজ এই ভ্রান্ত ধারনা গুলোর ওপর একটু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।
পঞ্চ-ম-কার এর মধ্যে পড়ে :-
মদ্য
মাংস
মৎস্য
মুদ্রা
মৈথুন
যে কোন অল্প অভিজ্ঞ বা অনভিজ্ঞ ব্যাক্তিই এই কটির নাম শুনলে অল্প হলেও ভিতরে সঙ্কুচিত বোধ করেন। ঈশ্বরের সাধনায় আবার এসব কি? এই মনোভাব অনেকেরই হয়। বর্তমান অবস্থায় তা হওয়াটা স্বাভাবিকও।
কিন্তু আজ এক সূক্ষ্ম তত্ত্ব জানাবো, তাতে আশা করি এই অজ্ঞানতার অন্ধকার কিছুটা দূরীভূত হবে।
প্রথমেই উল্লেখ্য যে স্বয়ং শিব এই তন্ত্রের শ্রষ্ঠা ও প্রবক্তা, সুতরাং স্বয়ং শিব নিশ্চয় এই আপাত ঘৃণিত বস্তু দ্বারা কোন ব্যাভিচারের কথা বলবেন না? নিশ্চয় এর কোনও না কোন সূক্ষ্ম তত্ত্ব আছেই...
অনেকের কাছেই পঞ্চ-ম-কারের সাধনা আসলে নিজের সুপ্ত ভোগ বাসনা চরিতার্থ করার নামান্তর, কিন্তু আদপেই তা নয়। আসুন আমরা সেই শিববাক্য তথা ভগবতীর অত্যন্ত প্রীতিপ্রদ গূঢ় সাধন রহস্য যা আমাদের পরমব্রহ্ম স্বরূপিণী জগৎ জননীর সঙ্গে মিলিত করে, সেই পবিত্র সাধন পদ্ধতি জানতে উদ্যোগ করি।
১) মদ্য 🔴
শিব বলছেন...
"সোমধারা ক্ষরেদ্ যা তু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ্ বরাননে।
পীত্বা আনন্দময় স্ত্বাং যঃ স এব মদ্য সাধক।।"
অর্থাৎ, হে বরাননে পার্বতী, সাধক যখন গাঢ় ধ্যানে অথবা সমাধি অবস্থায় অবস্থান করে, চিত্রার্পিতের ন্যায় তার অবস্থা হয়, তখন তার সহস্রার পদ্মের ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে যে অমৃত ধারা ক্ষরিত হয়, তাকেই তন্ত্রে সোমরস বা সুরা বলা হচ্ছে, সেই অমৃত ধারা সাধক পান করে নিজের ইষ্টসানিধ্য উপলব্ধি করে। এই প্রকার সাধককেই তুমি মদ্যসাধক বলে জেনো। এরই নাম মদ্য সাধন।
"যদুক্তং পরমং ব্রহ্ম নির্বিকারং নিরঞ্জনং।
তস্মিন প্রমদন জ্ঞানং তৎ মদ্য পরিকীর্তিতম্।।"
নির্বিকার নিরঞ্জন পরমব্রহ্মের যোগ সাধন দ্বারা যে প্রমদন জ্ঞান লাভ হয়, তার নামই মদ্য।
📌সহজ ভাষায় :- মদ্য আসলে জ্ঞান বা পরমানন্দের নেশা, যা পরমব্রহ্মের উপলব্ধিতে সাহায্য করে।
------------------------------------------
২) মাংস 🔴
শিব বলছেন...
"মা শব্দাদ্ রসনা জ্ঞেয়া তদ্ অংশান রসনাপ্রিয়ে।
সদা যো ভক্ষয়েৎ দেবী স এব মাংস সাধকঃ।।"
হে রসনাপ্রিয়ে মহাদেবী, মা শব্দের নামান্তর রসনা, এবং বাক্য সেই রসনা সম্ভুত, সুতরাং যে ব্যাক্তি সতত বাক্য ভক্ষন করে অর্থাৎ বাক্সংযম এবং মৌনব্রত পালন করে ইষ্টধ্যানে মগ্ন হয় সেই ব্যাক্তি কেই মাংসসাধক বলে জেনো।
"এবং মাং সনোতি হি যৎকর্ম তৎ মাংস পরিকীর্তিতম।
ন চ কায় প্রতীকন্তু যোগিভির্মাংসম্ উচ্যতে।।"
যে যোগী নিজের সকল সৎকর্মের ফল নিষ্কল পরমব্রহ্মে সমর্পণ করে সেই যোগীই মাংস সাধক, এবং এরই নাম মাংস সাধন।
📌সহজ ভাষায় :- মাংস হলো জিভের (রসনা) ওপর নিয়ন্ত্রণ বা নীরবতা (মৌন) পালন, পশুবৃত্তিকে দমন করা।
------------------------------------------
৩) মৎস্য 🔴
শিব বলছেন...
"গঙ্গা যমুন্যোর্মধ্যে মৎস্যৌ দ্বৈ চরতঃ সদা।
তৌ মৎস্যৌ ভক্ষয়েদ যস্তু স ভবেৎ মৎস্য সাধকঃ।।
হে ভগবতী, মনুষ্যদেহে ঈড়া ও পিঙ্গলা নামে যে দুই নাড়ী আছে, যোগশাস্ত্রে তাদেরই গঙ্গা ও যমুনা বলা হয়, এই দুই নাড়ী পথে অনবরত প্রশ্বাস ও নিঃশ্বাস নামে দুই মৎস্য বিচরণ করে। যে ব্যাক্তি প্রাণায়াম দ্বারা সেই দুই মৎস্যের গতি নিয়ন্ত্রণ করে কুম্ভকের পুষ্টি সাধন করে এবং প্রাণের গতিকে সুষুম্নানাড়ী তে চালনা করে সেই ব্যাক্তি কেই মৎস্য সাধক বলে জেনো, ইহাই মৎস্য সাধন।
"মৎস্যমানং সর্ব্বভূতে সুখদুঃখম্ ইদম্ প্রিয়ে।
ইতি যৎ সাত্ত্বিকং জ্ঞানং তৎ মৎস্য পরিকীর্তিতঃ।।"
আমার মত যে যোগী সর্বভুতে সুখ ও দুঃখ কে সমান জ্ঞান করে, সেই মৎস্য সাধক।
📌সহজ ভাষায় :- মৎস্য হলো প্রাণায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীর ও মনকে শান্ত করা।
------------------------------------------
৪) মুদ্রা 🔴
শিব বলছেন...
"সহস্রারে মহাপদ্মে কর্ণিকামুদ্রিতাচরেৎ।
আত্মা তত্রৈব দেবেশি কেবলঃ পারদোপমঃ।।
সূর্য্যকোটী প্রতীকাশ শ্চন্দ্রকোটী সুশীতলঃ।
অতীব কমনীয়শ্চ মহাকুণ্ডলিনীযুতঃ।
যস্য জ্ঞানোদয়স্তত্র মুদ্রাসাধক উচ্যতে।।"
হে দেবেশি, মনুষ্য শিরস্থিত সহস্রদল পদ্মে মুদ্রিত কর্ণিকার অভ্যন্তরে শুদ্ধ পারদশিবলিঙ্গ তুল্য আত্মার অবস্থিতি। যদিও এই শিবলিঙ্গের তেজ কোটী সূর্যের সমান কিন্তু কোটী চন্দ্রের কিরণের ন্যায় তা সুশীতল। এই পরম পদার্থ অতিশয় মনোহর, এবং কুণ্ডলীনিশক্তি যুক্ত হলে শিব পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হন। যে সাধক এই জ্ঞানের অধিকারী হয়, সেই সাধককে মুদ্রা সাধক বলে জেনো।
"সৎসঙ্গেন ভবেৎ মুক্তি, অসৎ সঙ্গেষু বন্ধনম্।
অসৎসঙ্গম্ উদ্রণৎ যৎ তৎ মুদ্রা পরিকীর্তিতা।।"
সৎসঙ্গে মুক্তি আর অসৎসঙ্গে বন্ধন, এই জ্ঞানলাভের পর যে অসৎসঙ্গ পরিহার করে, তাকেই মুদ্রা সাধক বলে জেনো।
📌সহজ ভাষায় :- মুদ্রা হলো সৎসঙ্গ বা শুদ্ধ স্থানে বসে সাধনা করা।
------------------------------------------
৫) মৈথুন 🔴
শিব বলছেন...
"মৈথুনং পরমং তত্ত্বং সৃষ্টি স্থিতি অন্ত কারণম্।
মৈথুনাৎ জায়তে সিদ্ধির্ব্রহ্মজ্ঞানম্ সুদুর্লভং।।
কুলকুণ্ডলীনিশক্তির্দেহিনাং দেহধারিণী।
তয়া শিবস্য সংযোগো মৈথুনং পরিকীর্তিতম্।।"
হে ভগবতী, মৈথুন অতি পরম তত্ত্ব, এই মৈথুন তত্ত্বের ওপরেই সৃষ্টি স্থিতি ও সংহার নির্ভর করে। মৈথুন সাধনার মাধ্যমে সাধকের অতুল সিদ্ধি সহিত সুদুর্লভ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। সেই মৈথুন কি রকম? প্রত্যেক মানুষের আধারপদ্মস্থিত কুলকুণ্ডলীনি শক্তিকে সহস্রারপদ্মের পরমশিবের সঙ্গে মিলন ঘটাতে হয়, যে সাধক এই কুণ্ডলীনি শক্তিকে ষটচক্র ভেদ করিয়ে পরমশিবের সঙ্গে মিলন করাতে সক্ষম হন, তাকেই মৈথুন সাধক বলে জেনো, আর ইহাই মৈথুন সাধনা।
📌সহজ ভাষায় :- মৈথুন হলো মূলত শিব ও শক্তির মানে পুরুষ ও প্রকৃতির অভ্যন্তরীণ মিলন বা কুণ্ডলিনী জাগ্রত করা।
★স্থূল মৈথুনে যেমন আলিঙ্গন, চুম্বন, শীৎকার, অনুলেপ, রমণ ও রেতোৎসর্গ এই ছয় টি অঙ্গ আছে, তেমন এই সূক্ষ্ম মৈথুনেও এই ছয় টি বিভাগ আছে।
"আলিঙ্গং ভবেৎ ন্যাসশ্চুম্বনং ধ্যানম্ ঈরিতম।
আবাহনং শীৎকারঃ স্যাৎ নৈবেদ্যম্ অনুলেপনম্।।
জপনং রমণং প্রোক্তং রেতঃপাতশ্চ দক্ষিনা।
সর্বথৈব ত্বয়া গোপ্যং মম প্রাণাধিকে প্রিয়ে।।"
হে আমার প্রাণাধিক প্রিয়ে দেবী, যোগক্রিয়া, মাতৃকাদি, ঋষ্যাদি ও তত্ত্বাদি ন্যাসের নামই হল আলিঙ্গন। ইষ্টধ্যানের নাম হল চুম্বন। ইষ্ট আবাহনের নাম শীৎকার, ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদিত নৈবেদ্য হল অনুলেপন, এবং জপ হল রমণের নামান্তর ও দক্ষিণাদান হল রেতঃ পাতের নামান্তর, এই গুহ্যাতিগুহ্য তত্ত্ব তুমি সর্বদা গোপন করে রেখ দেবী।★
------------------------------------------
(শেয়ারে কোনো বাধা নেই। কপি পেস্ট করবেন না।)
✍️Pradip Bhowmick
©The Divine And Destiny
কালী কালী🔱 হর হর মহাদেব 📿🙏
📱Whatsapp 096747 54439🧿
thedivineanddestiny@gmail.com
**ra