21/02/2026
# অষ্টবসু: বৈদিক ও পৌরাণিক ঐতিহ্যে প্রকৃতির আট দ্যুতিময় দেবশক্তির বিস্তৃত পরিচয়
অষ্টবসু হিন্দু বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্যে উল্লেখিত আটজন মহাশক্তিশালী দেবতা, যাঁরা মূলত প্রকৃতির মৌলিক উপাদান ও জাগতিক শক্তির প্রতীক। “বসু” শব্দের অর্থ ধন, ঐশ্বর্য বা প্রাকৃতিক সম্পদ—অর্থাৎ যাঁদের মাধ্যমে বিশ্বজগত সমৃদ্ধ ও সঞ্জীবিত। ঋগ্বেদসহ বিভিন্ন বৈদিক গ্রন্থে তাঁদের উল্লেখ আছে, পরে পুরাণ ও মহাকাব্যে তাঁদের কাহিনি আরও বিস্তৃত হয়েছে। অষ্টবসুগণ দেবরাজ ইন্দ্র-এর সহচর হিসেবে দেবলোকের কার্যসম্পাদনে অংশ নিতেন।
পৌরাণিক বংশপরিচয় অনুযায়ী, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা-এর মানসপুত্রদের বংশধারায় মনু, প্রজাপতি প্রমুখের মাধ্যমে অষ্টবসুর উদ্ভবের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন পুরাণে বংশতালিকায় সামান্য ভিন্নতা থাকলেও আট বসুর নাম সাধারণত এক ও অভিন্ন।
অষ্টবসুর নাম ও তাঁদের প্রতীকী তাৎপর্য নিম্নরূপ—
১. আপ (অপ) — জলের দেবতা। নদী, সমুদ্র ও জীবনধারণের মৌলিক উপাদান জল তাঁর আধিপত্যে। কখনও তাঁকে গঙ্গার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
২. ধর (ধরা) — পৃথিবীর প্রতীক। স্থিতি, স্থায়িত্ব ও ভৌত জগতের দৃঢ়তার রূপ।
৩. ধ্রুব — নক্ষত্র বা ধ্রুবতারা-সদৃশ অচল স্থিতির প্রতীক। আকাশে চিরস্থায়ী অবস্থানের কারণে স্থায়িত্বের চিহ্ন।
৪. সোম — চন্দ্রদেব ও অমৃতের আধার। যজ্ঞীয় সোমরসের অধিষ্ঠাত্রী শক্তি হিসেবেও পরিচিত।
৫. অনিল — বায়ুর দেবতা। প্রাণশক্তি ও গতি তাঁর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
৬. অনল — অগ্নির প্রতীক। তাপ, শক্তি ও রূপান্তরের দেবতা।
৭. প্রত্যূষ — ভোর বা ঊষার সূচনা। নতুন দিনের আলো ও সম্ভাবনার প্রতীক।
৮. প্রভাস — জ্যোতি বা আলোকের দেবতা। দীপ্তি, উজ্জ্বলতা ও আভা তাঁর আধিপত্যে।
অষ্টবসুর সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কাহিনি পাওয়া যায় মহাকাব্য মহাভারত-এ। একবার বসুগণের একজনের স্ত্রী ঋষি বশিষ্ঠ-এর আশ্রমে থাকা কামধেনু গাভী নন্দিনীকে লোভবশত চুরি করতে উৎসাহিত করেন। বসুগণ সম্মিলিতভাবে সেই গাভী হরণ করলে বশিষ্ঠ ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের মর্ত্যলোকে জন্ম নেওয়ার অভিশাপ দেন।
অভিশাপপ্রাপ্ত বসুগণ অনুতপ্ত হয়ে ঋষির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন বশিষ্ঠ জানান, তাঁদের মধ্যে সাতজন পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে অল্পকালেই মুক্তি পাবেন; কিন্তু যিনি মূল অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তাঁকে দীর্ঘকাল মানবজীবন যাপন করতে হবে।
এই অভিশাপের ফলেই বসুগণ মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু ও দেবী গঙ্গা-এর গর্ভে তাঁদের জন্ম হয়। গঙ্গা দেবী প্রতিটি নবজাতক সন্তানকে জন্মের পরপরই জলে বিসর্জন দেন, যাতে তারা দ্রুত শাপমুক্ত হয়ে দেবলোকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। কিন্তু অষ্টম সন্তানকে তিনি বিসর্জন দিতে গেলে শান্তনু বাধা দেন। সেই সন্তানই পরবর্তীকালে মহাবীর ভীষ্ম নামে খ্যাত হন।
ভীষ্ম ছিলেন সেই বসু, যাঁকে দীর্ঘকাল মানবজীবনে অবস্থান করতে হয়েছিল। তাঁর পূর্বনাম ছিল দেবব্রত। আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন ও পিতার সুখের জন্য রাজসিংহাসনের দাবি ত্যাগের ভীষণ প্রতিজ্ঞার কারণে তিনি “ভীষ্ম” উপাধি লাভ করেন। তিনি কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
অষ্টবসুর কাহিনি কেবল দেবতাদের শাস্তি ও মুক্তির গল্প নয়; এটি নৈতিক শিক্ষা ও কর্মফলের দর্শনও বহন করে। লোভ, কর্তব্য, অনুশোচনা ও প্রতিজ্ঞার মতো মানবীয় গুণাবলি এই পৌরাণিক আখ্যানের মাধ্যমে গভীর তাৎপর্য লাভ করেছে। বৈদিক দর্শনে বসুগণ প্রকৃতির মৌলিক শক্তির প্রতীক—জল, অগ্নি, বায়ু, আলো, পৃথিবী, চন্দ্র, নক্ষত্র ও প্রভাত—যাঁদের সমন্বয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্থিতি ও সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়।
অতএব, অষ্টবসু কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন; তাঁরা প্রকৃতির চিরন্তন শক্তির প্রতীক, যাঁদের মাধ্যমে সৃষ্টির ভারসাম্য ও ঐশ্বর্য প্রকাশিত হয়েছে।
Tantrik Sadesh Acharya