20/04/2026
ঈশ্বর নিশ্চয়ই তাকে ভাল জায়গা দিয়েছেন। তাঁর কর্মই তাকে অমর করে রাখবে। Rest In Peace.
মনে পড়ে ডাকসুর জিএস
আবদুল কুদ্দুস মাখনকে?
১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে পদপ্রার্থী ছিলেন।
সেই সময়ে আমি তাঁর প্রচার -প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলাম।
তাঁর সঙ্গে বহুবার কথা হয়েছে - তিনি আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন।
১৯৭০ সালে আবদুল কুদ্দুস মাখন এম, এ, প্রথম পর্ব এল,এল,বি'র ছাত্র ছিলেন। তাঁর ক্রমিক নং ছিল এফ ২৫১
পরিচিতি সভায় তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, কৃতি ও মেধাবী ছাত্র, উদীয়মান সাংবাদিক, সুনিপুণ লেখক, প্রথম শ্রেণির বক্তা, সুদক্ষ সংগঠক, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রভৃতি গুণের অধিকারী যে নাম আবদুল কুদ্দুস মাখন - তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র -ছাত্রীদের অতি প্রিয় মাখন। চার বছরের বিশ্বিবদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে আবদুল কুদ্দুস মাখন ছাত্রছাত্রীদের মাঝে নিজের স্থান করে নিয়েছে সত্যিকারের ভাই হিসেবে। তার মধুর ব্যবহার, হাসি হাসি মুখ, মিষ্টি ভাষা সকলের আকর্ষণ সৃষ্টি করে। সে প্রিয় মাখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম বারের প্রত্যক্ষ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণের পর আন্দোলন চলাকালে প্রতিটি মিছিলে যে কন্ঠ সবার কন্ঠকে চাপিয়ে বজ্রস্বরে স্লোগান দিয়ে উঠতো, যে কন্ঠ আজও 'তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা -মেঘনা -যমুনা' কিংবা 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলা মাকে মুক্ত করো' ধ্বনিতে আকাশ - বাতাস কাঁপিয়ে তোলে সে আবদুল কুদ্দুস মাখনকে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসাবে পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা গর্বিত। মধুর কেন্টিন, বলাইর রেস্তোরাঁ, ক্লাস রুম, হল কেন্টিন, ডাইনিং হল অর্থাৎ যেখানে সকলেই একটি বিষয়ে একমত যে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য প্রয়োজন আবদুল কুদ্দুস মাখনের মতো সর্বেগুণে গুণান্বিত একজনকে। তাই একথা বলতে দ্বিধা নেই যে আবদুল কুদ্দুস মাখন শুধুমাত্র একটি ছাত্র সংগঠনের মনোনীত প্রার্থীই নয়, সে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদেরও মনোনীত প্রার্থী........
তারপর স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত। 'বিপুল ভোটে যাবে গো রব -কুদ্দুস পরিষদ' - এই স্লোগান ছিল আমাদের মুখে মুখে। তারপর কেটে গেল ৫৬টি বছর।
সেই আবদুল কুদ্দুস মাখন আজ বেঁচে নেই! ভাবতে কি-ই না কষ্ট লাগে! ভাবি, জীবন এতো ছোট কেন রে....!
আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিরাজউদ্দীন হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও প্রথম শ্রেণির বৃত্তি লাভ করেন।
১৯৬৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আই, এ পাস করেন। অতঃপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বৃত্তি লাভ করেন।
১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় বিভাগে সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স সহ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে এম, এ পাস করেন।
আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৬৮ -৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাব এডিটর ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে আবদুল কুদ্দুস মাখন বই পড়তে খুব ভালবাসতেন। সংগীত সাধনা তাঁর হবি ছিল। ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, হকি, টেবিল টেনিস তার প্রিয় খেলা ছিল।
তিনি একজন মুক্তিবাদী সিনেমা ক্রিটিকও ছিলেন।
সেই ১৯৭০ সালে আবদুল কুদ্দুস মাখন প্রায়ই বলতেন, 'সমাজের আমূল পরিবর্তনের জন্য শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনাই যথেষ্ট নয়, একটি জাতি গঠনে প্রয়োজন জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ হতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের।'
শিল্প ও সাহিত্য সংঘ, হিন্দোল, মৃদংগ প্রভৃতি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবদুল কুদ্দুস মাখন বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে বদ্ধপরিকর।
১৯৭০ এর দশকের শুরুতে দেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের অধীনে তিনি মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক ছিলেন।
আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৭৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আবদুল কুদ্দুস মাখনের জন্ম ১৯৪৭ সালে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামে।
তাঁর মৃত্যু ১৯৯৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।
আবদুল কুদ্দুস মাখনের
মৃত্যু -
১৯৯৪ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসজনিত জন্ডিসরোগে আক্রান্ত হয়ে লিভার সিরোসিসে আমেরিকার ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
পিতা ও মাতা -
আবদুল কুদ্দুস মাখনের পিতার নাম মোহাম্মদ আবদুল আলী ও মাতার নাম আমেনা খাতুন।
ছাত্র নেতা -
ছাত্রনেতা হিসাবে আবদুল কুদ্দুস মাখন ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তিনি ছিলেন চার খলিফার
এক খলিফা -
১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার সদস্যের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।১৯৭১ সালের ১ মার্চ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ.স.ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ, স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য নেতা সহকারে আবদুল কুদ্দুস মাখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন চত্বরে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। পরদিন ৩ মার্চ তিনি তাঁর সহকর্মীসহ শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক ঘোষণা দেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। পূর্বাঞ্চলীয় লিবারেশন কাউন্সিলের ছাত্র প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবদান -
১৯৭২ সালে আবদুল কুদ্দুস মাখন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন কালে শেখ মুজিবুর রহমানকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়। ভারতের কলকাতায় ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী মেলায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ -
১৯৭৩ সালে ছাত্রনেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত -
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক বিশ্ব যুব উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলে ছিলেন -
১৯৭৫সালের ২৩ আগষ্ট রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৮ সালের ১২ নভেম্বর জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দলটির জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন।
শেষ কথা -.
সবশেষে বলতে হয়, আবদুল কুদ্দুস মাখন
ছিলেন একজন আদর্শবান ছাত্রনেতা ও রাজনীতিবিদ। নৈতিকতা, সততা, ও উচ্চ মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন তিনি, তাকে অন্যরা অনুকরণ বা অনুসরণ করতে পারে।
আবদুল কুদ্দুস মাখনের গুণগুলি হলো, তিনি ছিলেন
অত্যন্ত সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং নীতিবান।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। তার আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও চিন্তা-ভাবনা সমাজে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত বা আদর্শ হিসেবে কাজ করতে পারে।
লোভ, হিংসা ও অহংকার থেকে মুক্ত এবং ধৈর্যশীল ছিলেন তিনি। মানবতাবাদী ছিলেন আবদুল কুদ্দুস মাখন - নিজের স্বার্থের চেয়ে সমাজের বা মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পছন্দ করতেন তিনি তার জীবদ্দশায়। সমাজে আবদুল কুদ্দুস মাখনের মতো সৎ মানুষ কালেভদ্রে জন্মায়। আর এজন্যই আমাদের চোখের পাতায় বারেবারে এই মানুষটির প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। ছাত্র রাজনীতির অঙ্গনে ১৯৭০ এর দশকের প্রারম্ভে তিনি ছিলেন একটি ধ্রুবতারা। মাত্র ৪৬টি বসন্ত যেতেই সেই ধ্রুবতারা খসে পড়েছিল।
লিয়াকত হোসেন খোকন
মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ ও বিকাশ নাম্বার
০১৭১৫২৩১৬৭৫
লেখা পড়ে ভাল লাগলে ইচ্ছে হলে খুশি মনে সম্মানীও পাঠাতে পারেন।