23/11/2025
দাঁতের ব্যথা সাধারণত গাল ফুলে ওঠা, খাবার চিবোতে কষ্ট, মাঝে - মাঝে মাথাব্যথার মতো ঝামেলার মধ্যে আমাদের দৃষ্টি সীমিত করে রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণা যেন দাঁতের চিকিৎসাকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ করে দিল। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা দু’ বছর ধরে ৬৫ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, সফল রুট ক্যানাল চিকিৎসার পর শুধু ব্যথাহীন হাসিই ফিরে আসেনি — রক্তে শর্করার মাত্রা কমেছে, আর হৃদরোগের ঝুঁকিও এক ধাপ কমেছে।
শুনতে অবাক লাগলেও যুক্তিটা খুব সোজা। চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা ডেন্টাল ইনফেকশন শরীরে এক ধরনের নীরব আগুন জ্বালিয়ে রাখে —
ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন
শরীরের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ যেন মধুপিপাসু মৌমাছির মতো ডায়াবেটিসকে আরও খিটখিটে করে তোলে। রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়, আর এর সঙ্গে বহু জটিলতার সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। দাঁতের শিকড়ে পুঁজ জমে থাকা — আমরা যাকে সাধারণ সর্দিজ্বরের মতো হালকা অসুখ ভাবি — সেটাই আসলে এই প্রদাহের অন্যতম উৎস।
গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমিত দাঁতের শিকড় পরিষ্কার করে রুট ক্যানালের মাধ্যমে যখন সঠিকভাবে চিকিৎসা করা হয়, তখন সেই নীরব প্রদাহের উৎসটা বন্ধ হতে থাকে। শরীর ধীরে ধীরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। প্রদাহ কমে যাওয়ায় ইনসুলিন আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, রক্তে শর্করার ওঠানামা কমে যায়। একই সঙ্গে হৃদপিণ্ডও পায় স্বস্তি — কারণ দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহই হৃদরোগের অন্যতম বড় শত্রু।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে — একটা দাঁতের চিকিৎসা কি সত্যিই এতটা প্রভাব ফেলতে পারে ? হয়তো রুট ক্যানালের সুফল আমরা আগে এত বিস্তৃতভাবে জানতে পারিনি। কিন্তু চিকিৎসা - বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক ধারাই আমাদের বলে, শরীর আলাদা - আলাদা যন্ত্রপাতির সমষ্টি নয় ; বরং এটি এক প্রবাহমান সিস্টেম। মুখের ভেতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংক্রমণও তাই রক্তনালীর ভেতর, হরমোনের কার্যকারিতা কিংবা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে ঢেউ তুলতে পারে।
এই গবেষণা তাই আরেকবার মনে করিয়ে দেয় — ডেন্টাল কেয়ার শুধুই সৌন্দর্য বা আরামের ব্যাপার নয় ; এটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যের কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে যুক্ত। রুট ক্যানালকে অনেকেই ভয় পান, কেউ কেউ ব্যথা বা খরচের চিন্তায় এড়িয়ে যান। কিন্তু যখন এ ধরনের চিকিৎসা শরীরের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে, তখন সিদ্ধান্তটা হঠাৎই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
সম্ভবত ভবিষ্যতে ডাক্তাররা শুধুই দাঁতের ব্যথা নয় — ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা প্রদাহজনিত অসুখের রোগীদের মধ্যেও নিয়মিত ডেন্টাল স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেবেন। কারণ একটাই — স্বাস্থ্যই সম্পদ, আর দাঁত তারই অবিচ্ছেদ্য সূচনা বিন্দু।