05/09/2025
পেট ওপেন করতেই চক্ষু চড়কগাছ! জরায়ুর উপরে মোটা মোটা শিরা গুলো জড়িয়ে পেঁচিয়ে রয়েছে, ঠিক যেন কত গুলো কেঁচো! ছুরি চালানোর কোনো জায়গা নেই। ততক্ষণে অভিজ্ঞ চোখে ব্যাপারটা অনুমান করে নিয়েছেন ডাঃ নাগ। একজন গাইনী ডাক্তারের সবচেয়ে ভয়ের কারণ , মেডিকেলের ভাষায় ' প্লাসেন্টা পারক্রেটা ' মনে প্লাসেন্টা বা ফুলের অত্যধিক বৃদ্ধির জন্য বটগাছের শিকড় যেমন দেওয়াল ভেদ করে এপার ওপর চলে যায়, তেমনি এখানেই ফুলের শিকড় জরায়ু ভেদ করে মূত্র থলি ধরে নিয়েছে।
হালকা করে মাথাটা একটু টলে গেলো ডাঃ নাগের। অন্ধকার রাতে ঘন কুয়াশার মধ্যে বাইক নিয়ে পাহাড়ের রাস্তায় ছুটছেন মনে হলো। একদিকে উচ্চ পর্বতমালা আর ওই দিকে গহন অতল খাদ। প্রিয়ার আগে একটা 7 বছরের ছেলে আছে। এটা দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সি। খুবই মিষ্টি , প্রাণোচ্ছল সাবলীল একটি মেয়ে। চোখে অনেক স্বপ্ন , এই আট মাসে অনেকবার দেখাতে এসেছে, অনেকবার গল্পও হয়েছে। কত কথা শেয়ার করেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেই সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল ডাঃ নাগের।
'নাহ ! এখন ইমোশনাল হলে চলবে না! ডাঃ নাগ! বি স্টেডি ' নিজের মনেই নিজেকে ঝাকিয়ে দিলো । নিজের সব কম্পোজার, এক্সপেরিয়েন্স, কনসেন্ট্রেশন এক বিন্দু তে নিয়ে এলেন তিনি। আর কোনো প্রিয়া কে চিনেন না তিনি, স্থান, কাল পাত্র কিছু জানেন না তিনি, সামনে শুধু ঐ কেঁচো মতো কিলবিল করা জরায়ু, আর তিনি।
দ্রুত ইনসিসন দিয়ে বাচ্চা কে বার করে দিলেন, তার পর চলতে থাকল মূত্রথলিকে জরায়ু থেকে আলাদা করার চেষ্টা। হড়হড় করে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে, প্রত্যেকটা সেকেন্ড দাঁড়িপাল্লায় বিচার চলছে যমরাজের সাথে। অ্যাসিস্টেন্ট সাকশন করে যাচ্ছে, আরেকজন হাত দিয়ে কাঁচিয়ে কাছিয়ে রক্ত সরিয়ে অপারেশন সাইট পরিষ্কার করছে। দ্রুত গতিতে অপারেশন চলতে থাকে, মাথার কাছে আনেসথেসিয়ার ডাঃ মল্লিক মাঝে মাঝে যেনো সুদূর মাঠের প্রান্ত থেকে বলতে থাকে ' প্রেসার 92 বাই 54, পালস 123...'
এক এক করে জরায়ু বাদ দেওয়া হয়। মূত্রথলি সেলাই হয়, মেরুদণ্ডের দুই পাশে থাকে ' ইন্টারনাল ইলিয়াক আর্টারি ' , বড় দুরূহ তাকে খুঁজে বার করা। তার চারপাশে থেকে মূত্র নালি, একটারনাল ইলিয়ক আর্টারি, ভেইন, আরো কত স্ট্রাকচার। টাইম বোম্বের মধ্যে যেমন লাল তার নীল তার থাকে, যেমনটা সিনেমায় দেখায়, যেখানে সঠিকটা কাটলে বোম নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, আর অন্য কোনোটা কাটলে বিস্ফোরণ, এখানেও অনেকতা ওরকম। খালি এখানে কোনো লাল তার, নীল তার নেই, সব তার একই রকম দেখতে! সেই ' ইন্টারনাল আইলিয়াক আর্টারি বাঁধা হলো ব্লিডিং বন্ধ করার জন্য। আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে এলো সেই অনর্গল রক্ত প্রবাহ, লাল প্রস্রাব লালচে হলো। ওদিকে ডাঃ মল্লিক তখন মোটা মোটা সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত পুষ করছে বারংবার। পেট বন্ধ করা হলো।
স্ক্রাব টা খুলে চেঞ্জিং রুমের চেয়ারে ক্লান্ত শরীরটা ছুড়ে দিল ডাঃ নাগ। এলিয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করে মুখে একটা সিগারেট গুঁজে নিলো। আর ভাবতে থাকলেন সেই অজস্র রোগীদের কথা, যাদের শরীরে দীর্ঘদিন অভ্যেস করেছেন, ইমারজেন্সি Hysterectomy , যাদের শরীরে শিখেছেন মূত্রথলি রিপেয়ার, যাদের শরীরে শিখিয়েছে ইন্টারনাল ইলিয়াক বাঁধা, যাঁরা তাকে সার্জেন করেছে, যাঁরা তাকে সাহস যুগিয়েছে।
বিড়বিড় করে বলে ওঠে ডাঃ নাগ ' আজ প্রিয়া যদি সুস্থ হয়ে বাড়ি যায়, তাহলে সেটা আমার সাফল্য নয়, সেই সব রোগীদের অবদান, যাঁরা তাঁদের শরীর দিয়ে আমায় শিখিয়েছে, তোমরা প্রিয়া কে আশীর্বাদ করো '
Happy teachers day!
© মৈনাক