26/10/2025
আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, আর জি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের নৃশংস খুন ও ধর্ষণের প্রেক্ষিতে এবং লাগাতার আন্দোলনের চাপে নবান্ন সভাঘরে প্রশাসনিক আধিকারিক ও সরকারি কলেজগুলির অধ্যক্ষদের সাথে নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী-পুলিশমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী একটি বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকের লাইভ টেলি সম্প্রচার আপনারা সকলেই দেখেছিলেন এবং সেইদিন স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল হকিকত ও সরকারি হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আমরা করলেও আমাদেরকে জানানো হয়নি লাইভ সম্প্রচারের কথা। অতএব ধরেই নেওয়া যায় সেদিনের লাইভ সম্প্রচারের উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা ছিলনা, ছিল প্রচার।
সেদিন ঠিক কী প্রচারিত হয়েছিল? আশ্বাসের সুরে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী জানান, নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব সম্পন্ন করা হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্ভয়ে হাসপাতালে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর বহুবার সেই মিটিং সম্বন্ধীয় আপডেট ও পরবর্তী মিটিংয়ের জন্য অনুরোধ করা হলেও কোনোরকম উত্তর আমরা পাইনি। সদিচ্ছার অভাব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে ১২ মাস পরে গতকাল আবার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে একই কারণে বৈঠকের আয়োজন করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী। একই বিষয়ে আবার বৈঠকের অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, গতবছরের একটিও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি, যা এই রাজ্য প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার পরিচায়ক বলে আমরা মনে করি।
আবারও দেখা গেলো চেনা পরিচত ছন্দে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়া স্বাস্থ্য বিভাগীয় প্রধান বা ‘ম্যাডাম ম্যাডাম‘ করে ওঠা প্রশাসনিক কর্তাদের নিয়ে নাটকীয় আলোচনা সভায় নির্দ্বিধায় নিজের অকর্মণ্যতার দায় এড়িয়ে ভুরিভুরি মনভোলানো কথা শুনিয়ে দিনের শেষে অশ্বডিম্ব প্রসব করলেন মাননীয়া আর সাধারণ মানুষ তথা রোগীদের রেফার সমস্যা, নিরাপত্তা আর গুণমান সম্পন্ন ওষুধ প্রাপ্তির সম্ভাবনা প্রশ্ন চিহ্নই থেকে গেল!
অভয়া আন্দোলন-এর সময় West Bengal Junior Doctors’ Front বারবার চোখে চোখ রেখে শাসককে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নগ্নরূপ তুলে ধরে জানিয়েছিল —এই ব্যবস্থাপনায় কারওই নিরাপত্তা নেই। না ডাক্তার, না স্বাস্থ্য কর্মী না রোগী। তারই ফলস্বরূপ ও প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে আজ বাংলার বুকে একের পর এক ঘটনায় সেই সতর্কবাণীই যেন মর্মে মর্মে সত্যি হয়ে উঠছে।
পাঁশকুড়ায় স্বাস্থ্যকর্মী নিগ্রহ, উলুবেড়িয়ায় চিকিৎসক আক্রান্ত, বীরভূমে নার্সের উপর নৃশংস হামলা, আবার এসএসকেএম হাসপাতালে নাবালিকা রোগীর উপর নির্যাতন— সব ক’টি ঘটনাই যেন একই সুতোয় গাঁথা। কোথাও সুপারভাইজার, কোথাও ‘সিভিক ভলান্টিয়ার’, কোথাও ‘হোমগার্ড’ বা ‘কনট্রাকচুয়াল জিডিএ’— নাম আলাদা হলেও ছবিটা এক: হাসপাতালের ভেতরে অনিয়মিত, অস্থায়ী, রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।
আসলে সমস্যা রয়েছে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিচালনার মধ্যেই, এই সিস্টেমের মধ্যেই। সঞ্জয় রাই হোক বা বাবুলাল শেখ বা অমিত মল্লিক - সবাই চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী। এদের এত সাহস, হাসপাতালের যেকোন জায়গায় অবাধ যাতায়াতের এত সুযোগ হয় কী করে? হাসপাতালে কান পাতলে এদের নামে আগেও বিভিন্ন রকম দুষ্কর্মের অভিযোগ শোনা যায়। তা সত্ত্বেও এদের বিরুদ্ধে আগে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আমরা দেখছি এরাই হাসপাতাল গুলোতে টিকিয়ে রাখে দুর্নীতির সিস্টেম - টাকা নিয়ে বেড পাইয়ে দেওয়া হোক বা হাসপাতালে দালালরাজ - বোড়ে সৈনিক হিসাবে কাজ করে এরা, আর কাটমানি পাঠিয়ে দেয় যথাস্থানে। এরাই টিকিয়ে রাখে threat culture, r**e culture। এদের সাথে রয়েছে শাসক দলের সম্পর্ক, শাসক দলের নেতাদের প্রশ্রয়েই এদের মধ্যে আসে সেই দু:সাহস, সেই বেপরোয়া মনোভাব যেখান থেকে এরা ধর্ষনের হুমকি দেয়, খুনের হুমকি দেয়, এমনকি ধর্ষন বা খুন করে দিতেও পিছপা হয় না। এদের সবার নিয়োগ হয় এজেন্সির মাধ্যমে। এই এজেন্সি গুলোর মাথায় কারা থাকে, তাদের সাথে শাসক দলের সম্পর্ক কেমন, বা তারাই শাসক দলের মাথা কিনা - তা নিয়ে তদন্ত হয় না। তাই বাবুলাল শেখ হোক বা অমিত মল্লিক - এধরনের জঘন্য অপরাধীর জন্ম হতে থাকে একের পর এক।
আর জি কর আন্দোলনে আমরা বারবার জানিয়েছিলাম হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষার দায় কোনও অস্থায়ী বা বেসরকারি এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়া চলবে না। দাবি করেছিলাম হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মী নিয়োগ করতে হবে, কোনও কনট্রাকচুয়াল ব্যবস্থা নয়। কিন্তু তার বদলে চলতে থাকল সেই চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ, চালু রইল এজেন্সির মাধ্যমে অল্প বেতনে নিয়োগ করা, শাসক দলের ছত্রছায়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা চালু রইল, চালু রইল তাদের দিয়ে দুর্নীতি, অপরাধ, threat culture বজায় রাখা। ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হল না, এই অপরাধের আঁতুড়ঘর সিস্টেম থেকে একের পর এক অপরাধী জন্মাবে - এটা স্বাভাবিক।
আজ মুখ্যমন্ত্রী বলছেন হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মীদের প্রশিক্ষনের কথা। বোঝা গেল যে হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মীরা যে সঠিক ভাবে প্রশিক্ষন ছাড়াই কাজ করে চলেছেন সে সম্পর্কে সরকার অবগত। অথচ, এই প্রশিক্ষনের কোন ব্যবস্থা এতদিন করা হয়নি। আর জি কর আন্দোলনের সময় এক বছর আগেও এই প্রশিক্ষন দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা আজ অব্দি হয়ে ওঠেনি। সিসি টিভি অকেজো থাকার কথা, তা সঠিক ভাবে মনিটরিং না হওয়ার কথা আমরা এক বছর আগেও বারবার বলেছি। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সঠিকভাবে কাজ হবে, সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিল সব হাসপাতালে নাকি সব কাজ শেষ, কোথাও ১০০%, কোথাও ৯০%। আজ এক বছরেরও বেশি সময় পর মুখ্যমন্ত্রী বলছেন সিসিটিভি অকেজো থাকার কথা, মনিটরিং সঠিক ভাবে না হওয়ার কথা, আবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এগুলো সঠিকভাবে হবে। কিন্তু বছরের পর বছর একদিকে এই অন্ত:সার শুন্য প্রতিশ্রুতি আর অন্যদিকে রোগী-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিগ্রহের ঘটনা - ঘটে চলেছে সমান্তরাল ভাবে।
আমরা মনে করি হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা আর হাসপাতালের নিরাপত্তা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। হাসপাতালে সঠিক পরিকাঠামো নির্মান, সঠিক গুনমানের ওষুধ, যন্ত্রপাতির উপস্থিতি, সঠিক রেফারাল সিস্টেম আর নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যায় দক্ষ নিরাপত্তারক্ষী, অন কল রুম, কার্যকর সিসিটিভি - এসব ই প্রয়োজন হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার জন্য, ভালো কাজের পরিবেশের জন্য। আর সরকারের দায়িত্ব সেগুলো সঠিকভাবে কার্যকর করা, সেগুলোর দেখভাল করা। সেই দায়িত্ব পালন না করে, হাসপাতালের দুর্নীতি, threat culture এর সিস্টেম কায়েম রেখে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে 'চক্রান্ত' খুঁজে বের করার কথা বলা আসলে সরকারের নিজের অপদার্থতা ঢাকতে বিভ্রান্তি ছড়ানো বই কিছু নয়।
অভয়ার ন্যায়বিচার সহ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, রোগী-স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা, নারী নিরাপত্তা, উপযুক্ত কাজের পরিবেশ, পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থায়ী কর্মী নিয়োগের যে দাবি আমরা প্রথম থেকে তুলে আসছি সেগুলোই আসলে এই ঘুন ধরা স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন। সরকার যদি সত্যিই এই ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার চায় তাহলে এই লোকদেখানো sitting, meeting আর setting ছেড়ে মানুষের স্বার্থে আমাদের দাবিগুলো পূরনের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ দ্রুত নিক।