15/12/2025
Thank you Sir.
হাইড্রোসিল মানে কি শুধুই বিদ্রুপ আর উপহাস?
লিখেছেন বিশিষ্ট লেজার এন্ড এডভান্সড ল্যাপারোস্কপিক সার্জন Dr Dibyakanti Datta
https://www.facebook.com/share/15YFEMbHvs6/
অতি সম্প্রতি একটি ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ বিদ্রুপের ফোয়ারা চলছে। বুঝুন বা না-ই বুঝুন, হাইড্রোসিল কথাটা শুনে অনেকে ভাবেন গোপন রোগ, অনেকে মুখ টিপে হাসেন, অনেকে ভাবেন না জানি আর কি কি রোগ নিয়ে ঘুরছে! অনেকের মনে অনেক রকমের ধারণা, কিন্তু সত্যিটা ঠিক কি?
হাইড্রোসিল ঠিক কি?
পুরুষদের থলি বা স্ক্রোটামের মধ্যে যে দু'টি বলের মতো জিনিস থাকে তাদের বলা হয় অন্ডকোষ বা টেস্টিস। এই টেস্টিস পুরুষদের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্গ্যান, তাই এর উপর অনেক গুলি আবরণ বা আস্তরণ থাকে। এর মধ্যে একদম ভিতরে যে আবরণ থাকে তাকে বলা হয় টিউনিকা ভ্যাজাইনালিস। এই আবরণের দুটি লেয়ারের মধ্যে ফ্লুইড জমতে থাকলে টেস্টিস বা অন্ডকোষ বড়ো হতে থাকে, এই অবস্থাকে বলা হয় হাইড্রোসিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অনেকে টেস্টিসকেই হাইড্রোসিল ভাবেন, এটা ভুল ধারণা। নর্মাল অন্ডকোষ হলো টেস্টিস, আর জল জমে অন্ডকোষ যখন ফুলে ওঠে তখন তাকে বলা হয় হাইড্রোসিল।
কিভাবে হয় হাইড্রোসিল?
টিউনিকা ভ্যাজাইনালিস এর দুটি লেয়ারের মধ্যে যে জায়গা বা ক্যাভিটি, সাধারণত তাতে ফ্লুইড নিঃসৃত হয়, আবার শোষিত-ও হয়। সহজ ভাষায় ধরুন একটা জলের রিজার্ভার যার মধ্যে জল ঢুকছে, আবার জল বেরিয়েও যাচ্ছে। এবার যদি দেখা যায় জল ঢুকছে বেশি কিন্তু জল বেরোচ্ছে অনেক কম, তাহলে জল জমতে শুরু করবে। এক্ষেত্রেও সেরকম, ফ্লুইড জমছে বেশি কিন্তু বেরোতে পারছে না, তখন ফ্লুইড জমতে জমতে অন্ডকোষ ফুলে উঠবে।
হাইড্রোসিল কেন হয়?
চোট-আঘাত, ধাক্কা লাগা থেকে ফ্লুইড বেরোনোর যে রাস্তা তার উপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এখনকার কিছু মোটরবাইক আছে যেখানে চালকের সিট বেশ নিচে এবং পেট্রলের ট্যাঙ্ক অনেক উঁচুতে, এতে মোটরবাইক চালানোর সময় দীর্ঘক্ষণ সরাসরি চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘক্ষণ সাইকেল চালালেও একই রকম ভাবে চাপ পড়তে পারে। এছাড়া ইনফেকশন, ইনফ্ল্যামেশন, টিবি, টিউমার থেকে হতে পারে হাইড্রোসিল। ইনফেকশনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফাইলেরিয়া, এক্ষেত্রে হাইড্রোসিল অনেক বড়ো হয়ে যেতে পারে।
শিশুদেরও হাইড্রোসিল হতে পারে, যাকে বলা হয় কনজেনিট্যাল বা ইনফ্যান্টাইল হাইড্রোসিল। তবে এটি হয় সম্পূর্ণ অন্য কারণে, এক্ষেত্রে পেটের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম সংযোগ থেকে যায়, যার মধ্যে দিয়ে ফ্লুইড এসে জমা হয়।
উপসর্গ কি?
অন্ডকোষ ধীরে ধীরে ফুলতে থাকে, ব্যথা যন্ত্রণা সাধারণত হয় না। অনেক বড়ো হয়ে গেলে ভারী ভারী লাগে (যেটা ফাইলেরিয়াতে খুব কমন)
ভুল ধারণা কি কি?
হাইড্রোসিল কোনও সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিস নয়, কাজেই একজনের থেকে অন্যজনের হয় না। হাইড্রোসিল কারোর যৌন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে না, অর্থাৎ হাইড্রোসিল থেকে ইমপোটেন্স হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে থাকলে জটিলতা কি হতে পারে?
হাইড্রোসিলকে সমাজে এখনও গোপন রোগ হিসেবে দেখা হয়। ব্যথা যন্ত্রণা হয় না বলে রোগীও চিকিৎসক দেখাতে চান না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ফ্লুইড জমে থাকলে ইনফেকশন হয়ে পেকে যেতে পারে, যাকে বলা হয় `পায়োসিল'। এছাড়া চোট আঘাত লাগলে হাইড্রোসিলের মধ্যে সহজেই রক্তপাত হতে পারে, যাকে বলা হয় `হিমাটোসিল'।
এছাড়া, দীর্ঘদিন জমে থাকতে থাকতে হাইড্রোসিল ফ্লুইডের টেম্পারেচার বাড়তে থাকে। যেহেতু এই ফ্লুইড টেস্টিসের সংস্পর্শে থাকে, তাই টেস্টিসের টেম্পারেচারও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে অন্ডকোষের মধ্যে শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং তার থেকে পুরুষ বন্ধ্যাত্বও হতে পারে।
চাকরিপ্রার্থীদের জেনে রাখা জরুরি,
চাকরি পাওয়ার পর যে মেডিক্যাল টেস্ট হয়, তাতে হাইড্রোসিল পাওয়া গেলে ক্যান্ডিডেটকে আনফিট ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসা কি?
হাইড্রোসিলের একমাত্র চিকিৎসা অপারেশন, ওষুধে সারে না। অপারেশন করে ফ্লুইড ড্রেনেজের জন্য অন্য রাস্তা করে দেওয়া হয়, এর ফলে ফ্লুইড আর জমতে পারে না।
সিরিঞ্জ দিয়ে জল বার করে দিলে হবে না?
একশিরা বা হাইড্রোসিলের জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি সিরিঞ্জ দিয়ে জল বার করে দেওয়া। গ্রামেগঞ্জে যেখানে সচেতনতা অনেক কম সেখানে অনেকেই গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য এই পদ্ধতি করান। এই পদ্ধতিতে সিরিঞ্জ দিয়ে জল বার করে দিয়ে রোগীদের ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার জল জমে যায়, তাই আবার আগের মতো ফুলে যায়। শুধু তাই নয়, অপরিষ্কার জায়গায় অপরিষ্কার সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে তার থেকে ইনফেকশন হতে পারে, আবার সিরিঞ্জে খোঁচাখুঁচি হলে তার থেকে রক্তপাতও হতে পারে। কমপ্লিকেটেড হয়ে গেলে অনেক সময় শেষ পর্যন্ত টেস্টিস কেটে বাদও দিতে হতে পারে।
সচেতনতা জরুরি, উপহাস নয়
সার্জেনের কাছে সঠিক অপারেশন করালে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন, পরে অসুবিধা হয় না কোনও। কাজেই হাইড্রোসিল হলে চেপে রাখবেন না, চিকিৎসক দেখিয়ে সঠিক চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে উঠুন। আর আপনার চেনা জানা কারোর হাইড্রোসিল হলে তাঁকে উপহাস করবেন না, বরং চিকিৎসক দেখিয়ে সঠিক চিকিৎসা করিয়ে নিতে বলুন।