01/04/2026
স্বপ্নের জ্বালানি
--- Dr. Mashiur Rahman ---
আবির সাহেব একটি বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম না বললেও চলে, কারণ এই ধরনের প্রতিষ্ঠান দেশে অনেক আছে — যেখানে সকাল নয়টায় ঢুকতে হয়, বিকেল পাঁচটায় বের হওয়া যায় না, এবং মাস শেষে বেতন পেলে মনে হয় কেউ একজন রসিকতা করেছে।
আবির সাহেবের বয়স বত্রিশ। চেহারা মোটামুটি। মাথায় চুল আছে, তবে সংখ্যায় কমছে — ঠিক যেভাবে দেশে তেলের মজুদ কমছে। এই দুটো বিষয় নিয়ে তিনি সমান চিন্তিত।
তেলের সমস্যা এখন প্রকট। পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন। সিএনজি পাওয়া যায় না। রিকশাওয়ালারাও ভাড়া বাড়িয়েছেন, যদিও রিকশায় তেল লাগে না — এটা একটা আলাদা রহস্য।
অফিস থেকে ফিরে আবির সাহেব সেদিন রাতে ভাত খেলেন। তরকারিতে তেল কম ছিল। তেল কম থাকলে তরকারির স্বাদ কমে, এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। বৈজ্ঞানিক সত্য মেনে নিয়ে তিনি শুয়ে পড়লেন।
ঘুম এলো দ্রুত।
---
স্বপ্নে আবির সাহেব দেখলেন, তিনি একটি গবেষণাগারে বসে আছেন। গবেষণাগারটি দেখতে অনেকটা তাঁর বাড়ির রান্নাঘরের মতো, তবে সেখানে বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতি আছে। যন্ত্রপাতিগুলো দেখতে অনেকটা মিক্সার গ্রাইন্ডারের মতো, কিন্তু গায়ে ইংরেজিতে নানা কথা লেখা।
তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি একজন বিজ্ঞানী।
এই উপলব্ধিটা তাঁর ভালো লাগল। জীবনে কখনো বিজ্ঞানী হওয়ার সুযোগ হয়নি — স্কুলে বিজ্ঞানে নম্বর কম পেয়েছিলেন, কলেজে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় একবার হলের বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নে এইসব বাধা থাকে না। স্বপ্ন একটি গণতান্ত্রিক জায়গা।
আবির সাহেব তাঁর যন্ত্রের দিকে তাকালেন। যন্ত্রটির নাম তিনি নিজেই রেখেছেন — **"অ্যাকোয়া-ফুয়েল কনভার্টার মডেল এক্স"**। যদিও নামটা ঠিক বাংলা হলো না, কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষা আন্তর্জাতিক হওয়াই ভালো।
যন্ত্রটির মূল রহস্য হলো — চলন বিলের জল।
চলন বিল। বাংলাদেশের বুকে এক বিশাল জলরাশি। সেখানে এক বিশেষ ধরনের সবুজ প্ল্যাঙ্কটন আছে, শৈবাল আছে — যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। আবির সাহেব স্বপ্নেই বুঝে ফেললেন যে এই শৈবালের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ রাসায়নিক শক্তি। তাঁর যন্ত্র সেই শক্তিকে রূপান্তরিত করতে পারে বিশুদ্ধ জ্বালানিতে।
কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর স্বপ্নে জানার দরকার হয় না। স্বপ্নে শুধু জানতে হয় যে, *হয়*।
---
খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না।
পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে আবির সাহেব তাঁর কলিগ রফিক সাহেবকে বললেন, "রফিক ভাই, আমি একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছি।"
রফিক সাহেব চা খাচ্ছিলেন। চুমুক দিতে দিতে বললেন, "কী যন্ত্র?"
"চলন বিলের জল দিয়ে জ্বালানি বানানোর যন্ত্র।"
রফিক সাহেব আরেকটি চুমুক দিলেন। "কাল রাতে কী খেয়েছিলেন?"
"ভাত। তরকারিতে তেল কম ছিল।"
"সেটাই সমস্যা।"
কিন্তু আবির সাহেব দমলেন না। তিনি জানেন, মহান আবিষ্কারকদের প্রথমে কেউ বিশ্বাস করে না। গ্যালিলিওকেও বিশ্বাস করেনি। নিউটনের আপেলের গল্পও অনেকে মনে করেছিল বানোয়াট। আবির সাহেবের তরকারির তেলের গল্পও হয়তো একদিন ইতিহাসে লেখা হবে।
---
স্বপ্নের পরের অংশে আবির সাহেব দেখলেন, তাঁর আবিষ্কারের খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। শিরোনাম —
"চলন বিলের শৈবালে জ্বালানি বিপ্লব: আবিষ্কারক আবির সাহেব বললেন, এটা স্বপ্নেই মাথায় এসেছিল"
খবরটা ভাইরাল হলো। টেলিভিশনে লাইভ শো হলো। উপস্থাপিকা লাল শাড়ি পরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "আবির সাহেব, আপনার এই মুহূর্তে কেমন লাগছে?"
আবির সাহেব ভাবলেন, এই প্রশ্নটা কেন সবাই করেন বোঝা যায় না। তিনি বললেন, "ভালো লাগছে।"
"আপনি কি জানতেন যে আপনি এত বড় বিজ্ঞানী?"
"না।"
"কোনো বার্তা দিতে চান?"
আবির সাহেব একটু ভেবে বললেন, "তরকারিতে তেল কম দেবেন না।"
সারা দেশ হাততালি দিল।
---
এরপর এলো বিদেশিরা।
প্রথমে এলো জাপানিরা। তারা ছোটখাটো, হাসিখুশি, এবং সবকিছু ফটো তোলে। তারা যন্ত্রটার চারদিকে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলল, মাথা নাড়ল, এবং বলল, "সুগোই!" — যার অর্থ "অসাধারণ!"
তারপর এলো জার্মানরা। গম্ভীর মুখ, পুরু চশমা। তারা যন্ত্রটার ব্লুপ্রিন্ট চাইল। আবির সাহেব বললেন, "ব্লুপ্রিন্ট এখনো তৈরি হয়নি।" জার্মানরা বলল, "এটা অ্যানএক্সেপ্টেবল।" তারপরও থেকে গেল।
এলো আমেরিকানরা। তারা সঙ্গে আনল আইনজীবী। জিজ্ঞেস করল, "পেটেন্ট করা আছে?" আবির সাহেব বললেন, "না।" আমেরিকানরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করল।
এলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিনিধিরা। তারা একটু বিমর্ষ দেখাচ্ছিল — স্বাভাবিক, কারণ তেলের বিকল্প আবিষ্কার হলে তাদের ব্যবসায় টান পড়বে। তবু এলো, কারণ না এলেও সমস্যা।
সবশেষে এলো পাশের বাড়ির করিম সাহেব। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আবির ভাই, চলন বিলের জল কি ঢাকায় আনা যাবে? আমার গাড়িতে তেল নেই।"
---
তারপর শুরু হলো যাত্রা।
শত শত মানুষ চলল চলন বিলের দিকে। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস — সব মিলিয়ে এক বিশাল কাফেলা। রাস্তায় জ্যাম লাগল, কারণ সবার গাড়িতে তেল কম। কিছু গাড়ি মাঝপথে থেমে গেল। মানুষ হেঁটে চলল।
জাপানিরা হেঁটেও ছবি তুলছিল।
চলন বিলে পৌঁছে সবাই থমকে গেল।
বিলের জল সবুজ। দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে আছে শৈবালের চাদর। সূর্যের আলোয় সেই সবুজ যেন জ্বলছে। দূরে বকের সারি উড়ে যাচ্ছে। বাতাসে মাটির গন্ধ।
আবির সাহেব তাঁর যন্ত্রটা বিলের পাড়ে রাখলেন। পাইপ ঢোকালেন জলে। বোতাম চাপলেন।
যন্ত্র ঘুরতে লাগল।
গুনগুন শব্দ হলো।
সবুজ জল ঢুকতে লাগল।
মানুষেরা অপেক্ষা করছে।
জাপানিরা ক্যামেরা তুলে ধরেছে।
জার্মানরা স্টপওয়াচ দেখছে।
আমেরিকানদের আইনজীবী কলম বের করেছেন।
করিম সাহেব গাড়ির চাবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
এবং তারপর —
যন্ত্রের অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে এলো স্বচ্ছ, ঝকঝকে জ্বালানি।
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর ফেটে পড়ল উচ্ছ্বাস। জাপানিরা "বানজাই!" বলল। জার্মানরা হাততালি দিল — যা জার্মানদের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। আমেরিকানরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। আর করিম সাহেব দৌড়ে গিয়ে তাঁর গাড়িতে জ্বালানি ভরতে লাগলেন।
আবির সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন বিলের পাড়ে। বাতাস আসছে। সবুজ জল ঢেউ খেলছে। তাঁর চোখে জল আসার উপক্রম হলো।
তিনি ভাবলেন, এতদিন পর জীবনটা একটু —
ঠিক তখন —
---
"আবির! এই আবির! উঠবে না? সকাল আটটা বাজে!"
আবির সাহেব চোখ খুললেন।
সিলিং ফ্যান ঘুরছে। পাশে বালিশ। দূর থেকে রিকশার টুংটাং শব্দ আসছে।
তাঁর স্ত্রী দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, "চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আর শোনো, আজ বাজারে গেলে সয়াবিন তেল আনবে — এক লিটার। দাম বাড়ছে, তাই আগেভাগে কিনে রাখা ভালো।"
আবির সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন।
জানালা দিয়ে সকালের আলো আসছে।
চলন বিল নেই। যন্ত্র নেই। জাপানি নেই। জার্মান নেই।
শুধু এক লিটার সয়াবিন তেলের ফরমাশ আছে।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং বিড়বিড় করলেন, "এত সুন্দর স্বপ্ন — একটু পরে ভাঙলেই কি হতো না?"
কিন্তু স্বপ্নের কোনো সেন্স অফ টাইমিং নেই।
এটা স্বপ্নের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
*— সমাপ্ত —*