17/01/2026
ছেলের বিয়ে হলো। এতকাল ছেলে থাকতো মায়ের পাশেই, মায়ের রান্না খেতো, ছেলের খরচও অধিকাংশ হতো মায়ের জন্য। এখন বিয়ে হয়েছে, ছেলে স্ত্রী নিয়ে থাকে। এখন খরচও ভাগাভাগি হয়ে গেছে; স্ত্রীর কাপড়চোপড় কিনে দেয়া, স্ত্রীর পেছনেও ব্যয় করা হচ্ছে এখন। স্বামী স্ত্রী মাঝে মাঝে ঘুরতে যায়, পার্সোনালি সময় কাটানোর জন্য মা থেকে মাঝেমধ্যে দূরে থাকে।
আদরের-স্নেহের ছেলে কেমন যেন মা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে মনে হয় মায়ের। যদিও ছেলে খুব করে সমতা বজায় রেখেই চলে। তবুও মায়ের মন মানে না, বউ এর সাথে কত হাসিঠাট্টা, আনন্দ ফুর্তি করে। মা বুঝতে পারে না যে মা আর বউ এক নয়। দুজনের অবস্থান আলাদা। পার্থক্যগত অবস্থানের কারণে তাদের প্রতি ছেলের কার্যক্রম, আবেগ অনুভুতিও ভিন্ন হবে।
একদিন মা এসে দেখে ছেলে আর বউ মিলে বিছানায় বসে ইনডোর গেইম খেলতেছে। এবার মা নড়েচড়ে বসলেন। আমার সোনার ছেলের দুনিয়া ছিলাম আমি, আমার ছেলে আমার কথা ছাড়া কোনো কিছু করতো না, আমার ছেলের টাকা পয়সা সব আমার পিছেই খরচ করতো, আমার হিসাব থাকতো; আর এখন কোন এক মেয়ে পাইসে সব ভাগ বসাইছে!! বিয়ে তো সবাই করে, তাই বলে এমন বদলাবে কেনো। বউ থাকবে বউ এর মত!!
কি করা যায়?? কি করা যায়?? মা চায় সংসার থাকুক সংসারের মত। কিন্তু ছেলে যেন এত বউ পাগল না হয়, ছেলে যেন আগের মতই মায়ের পাগল থাকে।
এক আত্মীয়ের মাধ্যমে খোজ পেলেন এক হুজুরের। হুজুর নাকি কুর'আন দিয়েই সব কিছু করেন। ছেলে মেয়ে বশ, স্বামী স্ত্রী বিচ্ছেদ, কিংবা বাধ্য করা; সব পারেন। হ্যা, তবে কুরআন দিয়েই এসব করেন(!)
হুজুরের কাছে গেলেন মা, সব সমস্যা খুলে বললেন। হুজুর বললেন, আপনার ছেলে বড়ই জুলুম করছে এসব করে, এই ছেলেকে দেখেন অই বউ তাবিজও করতে পারে। আপনি বলেন মা, আমি তাবিজ কাটায় দিয়ে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ করে দেই।
মনুষ্যত্ব কিছুটা হলেও আছে বলে মা বললেন, না না বিচ্ছেদ দরকার নাই, একটু ছেলে যেন বউ থেকে দূরে থাকে, মেলামেশা কম করে, আর ছেলে যেন আমার কথা শোনে, আমার বাধ্য হয়। আপনার পারিশ্রমিক যা লাগে আমি দিব।
হুজুর রাজী হলেন। ছেলের ছবি আর একটা শার্ট চাইলেন। ৪১ দিনের মধ্যেই ফলাফল পাবেন বলে সর্বোচ্চ আশ্বাস দিলেন।
..
৩ মাস পর,
ছেলে আর ছেলের বউ এর সাথে দিনরাত তুমূল দ্বন্দ্ব, পান থেকে চুন খসলেই ছেলে তার বউকে অত্যাচার করে। বউ বেচারি একা একা ফুপিয়ে কাঁদে, এই কান্নাও সহ্য হয় না স্বামীর। মারতেও আসে। বউ ভাবে কেন তার স্বামী এত দ্রুত বদলে গেলো? কেন তাকে এখন চেনাই যায় না? কত রাত যায় স্বামী তার সাথে ঘুমায় না। রাত করে বাড়ি ফেরে, এসে মায়ের রুমে যায়, মায়ের সাথে কথাবার্তা বলে, হাত পা টিপে দেয়। একদিন বউ এসে স্বামীকে ডাক দিতে গেলে সে কি ঝাড়ি একসাথে ছেলে আর ছেলের মায়ের! ছেলে চিল্লায়ে বলে, আমার মায়ের সাথে আমি সময় কাটাই, তোমার দেখি এটাও সহ্য হয় না। তুমি কি চাও আমাকে আমার মা থেকে আলদা করতে??
মাঝে মাঝে ডাইনিং এ মা বসে সব শোনে আর সন্তুষ্টির মুচকি হাসি তার ঠোটের কোণায় প্রকাশ পায়। মনে মনে বলে, একদম ঠিক হইছে। আমার ছেলেরে আমার থেকে কাইড়া নিতে চাইছিলি এই জুলুম আল্লাহ সয় নাই। সইবোও না। জামাই তো আমারও ছিলো, আমি কি এমন করছি? নবীজি ﷺ কইসে সবার আগে মা, তিনবার কইসে মা। বউ এর কথা কয় নাই। বউ গেলে বউ আসে। মা আর আসে না।
ছেলে সারাক্ষণ মা মা করে। মা যা বলে তা-ই শোনে। স্ত্রীর খরচ তো দেয়ই না, যা কামাই সব মায়ের হাতে দেয়। হিসাব করে করে দেয়। এটাই তো মা চেয়েছিলো, ঠিক যেন আগের মতই।
একদিন ছেলে মা-কে বলে তার বউ নাকি সন্তান নিতে চায়। মা বাধা দেয়; বলে, এত আগে পোলাপান হইলে বউ অসুস্থ হইবো, ঘরের কাজকর্ম করতে পারব না। তোর এই বৃদ্ধ মারে দিয়ে কি তুই ঘরের কাজ করাইতে চাস? আরো সময় আছে, পরে বাচ্চাকাচ্চা নিস। আমি আর কতদিন আছি দুনিয়ায়। আগে তো মা, এরপর বাকিসব।
হুমম, ছেলের কাছে সব যৌক্তিকই লাগলো। আর বাচ্চাকাচ্চাই কিসের, স্ত্রীকেই তো আর ভাল্লাগে না। পরের টা পরে দেখা যাবে। আরেকবার বাচ্চা নেয়ার কথা বললে খবর আছে বউয়ের!!
(আমাদের এই দেশের হাজারো ঘটনার আয়না এই গল্পটি)